প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস—একটি দিন, যা শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেট আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই দিনটি (শ্রমিক দিবস) শুধু একটি দিবস নয়, বরং এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও আমরা কি আমাদের শ্রমিকদের সেই ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছি?
শ্রমিক অধিকার: আইনে আছে, বাস্তবে নেই
বাংলাদেশে শ্রম আইন রয়েছে—বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮), যেখানে কর্মঘণ্টা, মজুরি, নিরাপত্তা ও শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের অধিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের সীমা প্রায়ই লঙ্ঘিত হয়, এমনকি সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের International Labour Organization (ILO) অনুসারে, এখনও প্রায় ৮৫ লাখ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে, যাদের কোন স্বাস্থ্যসুরক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা বা ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত নয়।
২০২৩ সালের গার্মেন্টস শ্রমিক বিক্ষোভের সময় শ্রমিকরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২৩ হাজার টাকা দাবী করলেও সরকার ঘোষিত মজুরি ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের তুলনায় অপ্রতুল।
আরও পড়ুন – সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর; জ্বলছে নথি, নিভছে ন্যায়বিচার
নিরাপদ কর্মপরিবেশ: রানা প্লাজার ছায়া এখনও রয়ে গেছে
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস আমাদের শ্রমিক নিরাপত্তার চরম দুরবস্থার চিত্র বিশ্বদরবারে উন্মোচিত করেছিল। তবুও শ্রমিক নিরাপত্তায় স্থায়ী পরিবর্তন খুব সীমিত।
Accord ও Alliance নামের বৈশ্বিক উদ্যোগ কিছুটা অগ্রগতি আনলেও দেশের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থায় এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে।
নির্মাণ খাত, ট্যানারি, পরিবহন খাতে হাজারো শ্রমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করছে, প্রতিদিন দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ আহত বা নিহত হচ্ছে।
সংগঠনের অধিকার: ভয় ও নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খল
শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন এবং ধর্মঘটের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণমূলক আইন এবং নিয়োগদাতার চাপের মুখে বাধাগ্রস্ত হয়।
ILO Convention 87 ও 98 বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
অনেক কারখানায় ইউনিয়ন গঠনের চেষ্টা করলেই শ্রমিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়, এমন অভিযোগ বারবার এসেছে।
করণীয়: সম্মান, সুরক্ষা ও সংহতি
শ্রমিকরা শুধুমাত্র উৎপাদনের হাত নয়—তারা অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
শ্রমিকদের জন্য জীবনোপযোগী ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে যা ইনফ্লেশন এবং বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যয় বিবেচনায় নির্ধারণ করতে হবে।
নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সুবিধা, এবং যৌন হয়রানি বিরোধী কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
তদারকি ও শ্রম আদালতের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা আনতে হবে।
শ্রমিক দিবসের তাৎপর্য কেবল ফুলেল শ্রদ্ধা বা ছুটির দিনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি আত্মজিজ্ঞাসার দিন—আমরা কতটুকু এগিয়েছি শ্রমিক মর্যাদার পথে?
সমাজের প্রতিটি অংশ—রাষ্ট্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ—শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ না করলে ‘শ্রমিক দিবস’ হয়ে থাকবে শুধুই এক আনুষ্ঠানিকতা।
✍️
মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান সম্পাদক
enewsup.com (ইনিউজ আপ ডট কম)
তথ্যসূত্র:
Bangladesh Labour Law 2006 (amended 2018)
ILO Bangladesh Country Profile, 2023
Centre for Policy Dialogue (CPD), Minimum Wage Study 2023
Clean Clothes Campaign, 2023
The Daily Star / Prothom Alo archives on labour protests







