এ এক অন্যরকম রাজশাহী শহর। শহরের এখানে-সেখানে, ফাঁকা জায়গায় অসংখ্য তাঁবু। সেখানে ত্রিপল বিছিয়ে, কাথা-বালিশ নিয়ে কেউ ঘুমোচ্ছেন, কেউ মেতে উঠেছেন খোশগল্পে, কারও কারও কণ্ঠে জাগরণি গান। এই দৃশ্য বৃহস্পতিবার (১ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকের।
প্রথম দেখাতে মনে হতে পারে, এ বুঝি কোনো শরণার্থী শিবির। না, তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশ থেকে পালিয়ে এসে এখানে আশ্রয় নেওয়া কোনো শরণার্থী নয়, তারা সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী। এসেছেন আগামী শনিবার (৩ ডিসেম্বর) বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় গণসমাবেশে অংশ নিতে।
পরিবহন ধর্মঘট থাকায় বুধবার বিকাল থেকেই রাজশাহী শহরে আসতে শুরু করেছেন আশপাশের জেলাগুলো থেকে। বিভিন্ন স্থানে তাঁবু টাঙিয়ে, তীব্র ঠান্ডা ও মশার কামড় উপেক্ষা করে সেখানেই রাত কাটিয়েছেন তারা।
আজও দেখা গেছে রাজশাহীতে দলে দলে ঢুকছেন বিএনপির বিভিন্ন জেলার নেতা-কর্মীরা। ৮-১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে বুধবার রাতে অনেকে সমাবেশস্থল মাদ্রাসা মাঠের পাশে শাহ মখদুম ঈদগাহের বিশাল মাঠে সমবেত হন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হবার সঙ্গে সঙ্গে ওই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তারা ওই মাঠেই খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল, পলিথিন বিছিয়ে রাত্রিযাপন করেন।
রাজশাহীর পদ্মা নদীর তীরে তীব্র ঠান্ডা এবং মশার কাপড় উপেক্ষা করে নেতা-কর্মীরা বুধবারের রাত পার করেন। একইভাবে কাটবে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার।
বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ থেকে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীরা সঙ্গে করে, নয়তো ট্রাকে করে বস্তায় বস্তায় চাল, মুড়ি, ডাল নিয়ে এসেছেন। এসব খাবার তারা ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন। মাদ্রাসা মাঠেই বড় বড় পাতিল,সসপ্যানে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে তিন বেলা। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে তা খাচ্ছেন, নিজেদের আগামী পরিকল্পনা করছেন।
সমাবেশস্থলের পাশেই এই ঈদগাহ মাঠে দফায় দফায় চলছে দলীয় স্লোগান, সভা। বিভিন্ন জেলার ব্যানারে রাস্তায় বের করা হচ্ছে মিছিল। এসব মিছিলে শত শত বিএনপির সমর্থক অংশ নিচ্ছেন। পাশেই সাজিয়ে তোলা হচ্ছে গণসমাবেশের মঞ্চ।
নাটোরের লক্ষীপুর ইউনিয়ন থেকে আসা ৭৫ বছর বয়স্ক হাজি মকবুল হোসেন বিএনপির একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি তিন দিন আগেই রাজশাহী শহরে এসেছেন। থাকছেন খোলা আকাশের নিচে। মকবুল হোসেন বলেন, ‘জিয়া থাকতে আমি বিএনপির সমর্থক। এখনও বিএনপির সমর্থক আছি। আগামীতেও থাকব। শীত, মশা উপেক্ষা করে আগামীর আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনব। এই সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।’
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা হায়দার আলী বলেন, ‘পরিবহন বন্ধ করার কারণে সবাই আগেই রাজশাহীতে আসতে বাধ্য হয়েছে। সরকারের পরিবহন বন্ধের পরিকল্পনা কাজে আসেনি। সবাবেশ হবে, আমার মতো লাখো মানুষ আসবে।’
পথে পথে পুলিশি হয়রানি, কেড়ে নেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, প্রতিটি মোড়ে পুলিশের তল্লাশি। বিএনপির সমর্থক বুঝতে পারলেই জেরা। দল বেঁধে যারা আসছেন, থামিয়ে পুলিশ ওই গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য করছে, সঙ্গে খাদ্যসামগ্রী থাকলে তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনটাই অভিযোগ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজশাহীতে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীদের।
রাজশাহী নগরীতে ১৭টি চেকপোস্ট ছাড়াও জেলার প্রতিটি সড়কে চেকপোস্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই চিত্র বিভাগের বগুড়া, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, পাবনা ও নাটোর জেলার। এসব জেলা থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বাস রিজার্ভ করে আজ সকাল পর্যন্ত রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হন।
প্রতিটি জেলার সড়কগুলোতে তাদের গাড়ি তল্লাশি করা হয়েছে। রাজশাহী পর্যন্ত আসার পর নগরীতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি ওই সব বাসকে। বেশি তর্ক করলে বাসে থাকা নেতা-কর্মীদের জন্য আগামী তিন দিনের খাদ্যসামগ্রী কেড়ে নেওয়া হয়।
নওগাঁর পত্নিতলা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও নওগাঁ জেলা মহিলা দলের সহসাধারণ সম্পাদক মরিয়ম বেগম শেফা বলেন, ‘দুটি বাসে করে নারী নেত্রীদের নিয়ে রাজশাহীতে প্রবেশ করছিলাম। তবে রাজশাহীর কাছে আসতেই বাস আটকে দেওয়া হয়। পুলিশ বাসটি ফিরে যেতে বলে। নওদাপাড়ায় পুলিশের সঙ্গে আমাদের তর্তাতর্কি শুরু হলে বাসে থাকা চাল, ডাল ও মুড়ির বস্তাসহ হাড়ি, প্লেট নামিয়ে নেয় পুলিশ। এমন অবস্থায় আমরা বাধ্য হই বাস থেকে নেমে যেতে। পরে স্থানীয় বিএনপির নেতারা এসে আমাদের সাহায্য করেন। বাস ছেড়ে দিয়ে আমরা প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে মাদ্রাসা মাঠ এলাকায় এসে উপস্থিত হই।’
জয়পুরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান প্রধান বলেন, ‘বুধবার বগুড়া ও জয়পুরহাট থেকে ১৮টি গাড়িতে করে নেতা-কর্মীরা আসছিলাম।। রাতে মোহনপুর উপজেলা পার হতেই পুলিশ গাড়ি থামিয়ে সমস্ত নেতা-কর্মীকে নামিয়ে দেয় এবং গাড়িতে থাকা খাদ্যসামগ্রী আটকে দেয়।’
রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে সারারাত বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতিটি সড়কে আটকে দেওয়া হয়েছে। তাদের বাস ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে ও সঙ্গে থাকা খাদ্য সামগ্রী কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যেখানেই অভিযোগ পেয়েছি সেখানেই রাজশাহীর নেতকর্মীরা ছুটে গেছি। পুলিশ ভাইদের বুঝিয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে চাই। কিন্তু পদে পদে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন নেতাকর্মীদের রাজশাহীতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তি, ক্ষুব্ধ যাত্রীরা
‘রাজনীতি কার জন্য? ক্ষমতায় আসার জন্য মরিয়া রাজনৈতিক দলগুলো। এরা জনসাধারণের জন্য রাজনীতি করে না। নিজেদের অস্তিত্ব টেকাতেই রাজনীতিবিদরা মানুষকে এভাবে জিম্মি করে রাখে।’
এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী ইমরান হোসেন। রাজশাহীতে শ্বশুরবাড়ি বেড়ানো শেষে আজ পরিবার নিয়ে ময়মনসিংহে বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে সকালে নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনালে এসে বাস বন্ধের খবরে এই কথাগুলো বলেন।
ইমরানের মতো অনেকেই জানেন না আজ থেকে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় পরিবহন ধর্মঘট। তাদের অনেকেই বাস টার্মিনালে আসছেন। কেউবা ফিরে যাচ্ছেন, আবার কেউবা বাধ্য হয়েই সিএনজি, নয়তো অটোরিকশায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন। এরই মধ্যে আজ থেকে সিএনজিচালক এবং মালিকরাও ধর্মঘটের ডাক দেবেন বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে রাজশাহী নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল, ভদ্রা মোড়, তালাইমারি, কামারুজ্জামান চত্বর ও নওদাপাড়া বাস টার্মিনালসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বাস স্টপেজ ঘুরে দেখা যায়, এসব পয়েন্ট থেকে কোনো বাস ছেড়ে যাচ্ছে না। বাস না পেয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকে অটোরিকশা বা সিএনজিতে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা করছেন।
আজ সকালে নগরীর শিরোইলে অবস্থিত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড় করিয়ে রাখ হয়েছে। চালক, হেলপার, সুপাইভাইজারদের সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন।
নাটোর রুটের বাসচালক রশিদ বলেন, ‘একদিন বাস বন্ধ থাকা মানে আমাদের আয় বন্ধ। এর মানে বাড়িতে সন্তানের লেখাপড়া, পরিবারের খাবার, বাড়ি ভাড়া জোগাড় নিয়ে দুশ্চিন্তা। আয় না থাকলেও বাস ছেড়ে যেতে পারছি না। পাহারা দিতে হচ্ছে। সামনের দিন নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। এসব রাজনীতি আমাদের কোনো কাজে আসবে না।’
নওগাঁ রুটের বাসচালক হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘এই ধর্মঘট সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলেছে।’
পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় বাস মালিক সমিতির সভাপতি সাফকাত মঞ্জুর বিপ্লব বলেন, এই ধর্মঘটের সঙ্গে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আমাদের রুজি-রোজগারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি দেশের মানুষও উপকৃত হবে।











