ভুল নকশা ও অব্যবস্থাপনার কারণে অবশেষে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে এয়ারপোর্ট–টঙ্গী–গাজীপুর বিআরটি (Bus Rapid Transit) সড়ক প্রকল্প।

১২ বছর ধরে চলা এ প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হলেও ক্রমাগত ত্রুটি ও অনিয়মের কারণে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইন উদ্দিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

৪২০০ কোটি টাকায় অসমাপ্ত প্রকল্প

২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২,০৪০ কোটি টাকা, কিন্তু বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪,২৬৮ কোটি টাকা। সম্প্রতি অবশিষ্ট ৩ শতাংশ কাজ শেষ করতে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ৩,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত চেয়ে আবেদন করে, যা পরিকল্পনা কমিশন ফেরত পাঠিয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে।

এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর: ‘পানির ঢেউয়ের মতো’ সড়ক নকশা

বুধবার (১৫ অক্টোবর) প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে গাজীপুর শিববাড়ি পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার সড়কের নকশা অত্যন্ত জটিল ও অগোছালো। কোথাও উড়াল সড়ক, কোথাও স্থল সড়ক—পুরো রুটটি যেন এক অনিয়মিত ঢেউয়ের মতো।
ফলে যান চলাচল জটিল হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে উত্তরা, আজমপুর, টঙ্গী চেরাগআলী ও কলেজ গেট এলাকায় যানজট এখন নিত্যদিনের সমস্যা।

১০ লেনের সেতু, কিন্তু মানুষ চলাচলের পথ নেই!

টঙ্গী বাজারে তুরাগ নদীর উপর নির্মিত ১০ লেনের বিআরটি সেতুতে গাড়ির জন্য বিশাল সুবিধা রাখা হলেও, সাধারণ মানুষের চলাচলের কোনো পথ রাখা হয়নি।
ফলে উত্তরা থেকে টঙ্গী বাজার এবং টঙ্গী বাজার থেকে উত্তরা যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

বেইলি ব্রিজে নদীপথ বন্ধ ৫ বছর

টঙ্গী বাজারে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের ফলে গত ৫ বছর ধরে তুরাগ নদীতে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একসময় যেখানে ট্রলার, নৌকা ও ছোট লঞ্চ চলত, এখন সেখানে অবরুদ্ধ নদীপথে স্তব্ধ হয়ে আছে স্থানীয় অর্থনীতি।

ভুল লিংক ডিজাইনে মহাসড়কে স্থায়ী যানজট

বিআরটি সড়কে অপরিকল্পিতভাবে গাড়ির লিংক রাখার কারণে এখন ঢাকা–টঙ্গী–গাজীপুর–ময়মনসিংহ–টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রতিদিনই ভয়াবহ যানজট দেখা দেয়।
বিশেষ করে চৌরাস্তা ও তেরাস্তা এলাকাগুলোতে সরাসরি সংযোগ থাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

টঙ্গী কলেজ গেট–গাজীপুর শিববাড়ি: মৃত্যুফাঁদে পরিণত সড়ক

এই অংশে শুধুমাত্র স্থলপথে যান চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় এবং কোনো নিরাপদ ফুটওভারব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং না থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
প্রতিদিন রাস্তা পার হতে গিয়ে আহত হচ্ছেন বহু মানুষ। এখন পর্যন্ত ২০০ জনের বেশি নিহত ও হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন এই রাস্তায়।

ভুল নকশায় পথচারীদের প্রাণহানি

পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সময় ডান-বাম দিকের পাঁচ ধাপে গাড়ির চাপা পড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে রাস্তাটি পথচারীদের জন্য এক ভয়াবহ বিপদে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি: দায়ীদের বিচার ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ

স্থানীয়রা বলছেন, ভুল নকশা ও দুর্নীতির দায়ে জড়িত প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
তাদের মতে, প্রকৃত সুফল পেতে হলে এই সড়ককে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করে এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর–মাওনা–চন্দ্রা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞ ও সরকারের মন্তব্য

বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “ঠিকাদারদের তোষণ করে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, কাজের অগ্রগতি হয়নি।”
প্রধান উপদেষ্টার সহকারী শেখ মইন উদ্দিন জানিয়েছেন, “বর্তমান সরকার প্রকল্পটি স্থগিত রেখেছে। তবে ভবিষ্যৎ সরকার চাইলে এটি পুনরায় চালু করতে পারবে।”

ভুল নকশা ও দুর্নীতির চরম পরিণতি

দীর্ঘ ১২ বছর ধরে জনগণের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে থাকা এয়ারপোর্ট–টঙ্গী–গাজীপুর বিআরটি সড়ক প্রকল্পটি এখন সরকারি ব্যর্থতা ও দুর্নীতির প্রতীক।

অবশেষে ভুল ডিজাইন ও অপচয়ের কারণে প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের নগর অবকাঠামো পরিকল্পনার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।