Home গদ্য-পদ্য “বয়ে বেড়ানো এক খন্ড কালো মেঘ”

“বয়ে বেড়ানো এক খন্ড কালো মেঘ”

189
0
বয়ে বেড়ানো এক খন্ড কালো মেঘ

চোখ দু’টো বন্ধ,কনুই পর্যন্ত ডান হাতটা দিয়ে কপালটি প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে চেয়ারে হেলান দিয়ে নেসার আলী কথা শুনছেন না ঘুমুচ্ছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
বিপরীত দিকে চেয়ারে বসা সলিমুল্লাহ তার নিয়ে আসা সমস্যার উপস্থাপন শুরু করলেন অনেক টা এইভাবে…
“সমস্যা টা আমার মাইয়্যার।

পরথম ধরা পরলো, একদিন আমরা নৌকা দিয়া সবাই বেড়াইতে যাইতেছিলাম,
হঠাৎ মধ্যে গাঙে নৌকা আইলে আমার মাইয়্যা সোমা পানির মধ্যে ঝাপ দিতে লয়।আমরা অনেক জোরাজোরি কইরা ওরে থামাই।তখন ওর বয়স প্রায় বারো বচ্ছর। পরে আরও দুইবার এরকম করায় আমরা ওরে নিয়া আর নৌকায় উঠি নাই।
ছোট বেলায় মা মইরা যাওনে নানির কাছে বড় হইছে, চুলার ধারে তেমন যায় নাই।পনের বচ্ছর বয়সে বিয়ার তিন দিন পরে, হঠাৎ চিৎকার কইরা রান্না ঘর থেকে বাইর হইয়া যায়। সাথে সাথেই সে কলতলায় গিয়া শরীলে পানি ঢালে।
এরকম ও সে আরও কয়েক বার করছে।

বিয়ার দেড় বচ্ছর পর আমার মাইয়্যার কোল জুইড়া ফুটফুটে চান্দের লাহান নাতনি আইলো।ভাবছিলাম আমার মাইয়্যা টা মনে হয় এইবার ঠিক হইয়্যা যাইবো কিন্তু না, আমার মাইয়্যার মাথাটা আরও খারাপ হইতে লাগলো।
আমার ছোট্ট নাতনি টা একটু কানলেই, দিন হইলেই ওরে গোসল করায় আর রাইত হইলে গামছা ভিজায়া শরীল মুছায়।
কত্ত করে বূঝায় সবাই বাচ্চার ঠান্ডা লাগবো।

কে হুনে কার কথা! আবার মাঝে মধ্যে একা একাই বাচ্চারে লয়া কান্দে আবার হাসে।
আমি আমার মাইয়্যারে ভালো করনের লাইগা হুজুরের পানি পড়া, ফকিরের তাবিজ কবজ,মাজারে মানত কোনো চিকিৎসাই বাদ রাখি নাই।
কিন্তু কিছুতেই কিচ্ছু অয় নাই।

শেষে পাড়ার এক ডাক্তারের কাছ থেকে আপনার ঠিকানা পাইয়াই ছুইটা আইছি।
আমার মাইয়্যা রে অখন ওর স্বামী আর রাখতে চায় না। ডাক্তার সাব আপনেই আমার শ্যাষ ভরসা। আমার মাইয়্যা টা রে আপনি বাঁচান… বলে কেঁদে ফেলেন সলিমুল্লাহ।

অনেক টা আড়মোড়া দিয়ে কথা প্রসঙ্গে জেনে নিলেন নেসার আলী, সোমার বয়স ছিলো পাঁচ বছর যখন ওর মা মারা যায়।
দুই বছরের বড় ভাই আছে,সে তার বাবার সাথেই থাকে। সোমার মা মারা যাওয়ার তিন মাস পরই ওর বাবা মানে সলিমুল্লাহ পুনরায় বিয়ে করেন। সলিমুল্লাহর ছোট এক ভাই আছে যে বছর সাতেক আগে বিয়ে করেছে।
এও জেনে নেন সোমার নানা বাড়ি সলিমুল্লাহর বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেক রাস্তার দূরত্ব।
নানীর কাছে বড় হওয়া সোমা সমবয়সীদের সাথে তেমন ভাবে মিশত না,চুপচাপ থাকতো। নানী স্কুলে আনা নেওয়া করতেন। পড়ালেখায় মোটামুটি মানের ছিল।জেসমীন আক্তার-লেখক

প্রসংগক্রমে নেসার আলী সলিমুল্লাহ র বাড়ির ঠিকানা ও আরও কিছু তথ্য নিয়ে নিলেন এবং পরবর্তীতে সোমাকে সাথে নিয়ে আসার কথা বলে একটা নির্দিষ্ট তারিখ দিলেন।
হ্যাঁ, নেসার আলী! একজন মনস্তাত্ত্বিক। মানসিক জনিত কোনো জটিলতা ও রহস্যের উদঘাটন করতে পারার মধ্যে তিনি অসীম আনন্দ পেয়ে থাকেন। তথ্য পাওয়ার প্রয়োজনে তিনি চষে বেড়ান একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সমস্যা জনিত মানুষের আবাস ঠিকানার অলি গলি যেমনই বাদ যায় না,তেমনই চায়ের টং দোকান কিংবা গ্রাম্য উঠোনের মাদুরে বসে আশি উর্ধ্ব বয়সী বৃদ্ধার সাথে কথা বলে ও তিনি তথ্য বের করে নেয়ার মধ্যে একটা যুদ্ধ জয়ের আনন্দ উপভোগ করেন।

সোমার বাবা সলিমুল্লাহর কথা থেকে যে বিষয়টি নেসার আলী কে ভাবাচ্ছে তা হচ্ছে আগুন ও পানি।সমস্যা টা দেখা দিয়েছে সোমার বয়স যখন বারো উর্ধ্বো।
বয়ঃসন্ধিকালের জটিলতা কি না কিংবা অবুঝ মনের প্রেম ঘটিত ব্যাপার কি না,সব ধারণাই মাথায় উঁকি দিয়ে যাচ্ছে নেসার আলীর। অভিভাবকরা অনেক কিছু গোপন করে তথ্য দেয় নেসার আলীর কাছে সে ধারণা ও নতুন নয়।
তথ্য উদঘাটন এর উদ্দেশ্যে নেসার আলী পা রেখেছিলেন সলিমুল্লাহর বাড়ির আশপাশ এবং বাড়িতে গিয়ে সোমার সাথে ও কথা বলে এসেছেন।

গ্রাম্য সরলতার মাঝে যে ও বিষন্ন দৃষ্টি পুরো চেহারাটিকে অস্বাভাবিক করে রেখেছে তা এড়ালো না নেসার আলীর চোখে ,
বড্ড মায়া হলো মেয়েটির জন্য।
বুকের কাছে কাপড়ের পুটলির মতো চেপে ধরে রেখেছে বাচ্চাটিকে যেন কেউ ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে।
শুধু হু হা করে নেসার আলীর সাধারণ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিল সোমা।
সলিমুল্লাহর বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে যে বিষয়টি নেসার আলীর চোখে অদ্ভুত ঠেকল তা হচ্ছে…
সলিমুল্লাহর আর তার ছোট ভাইয়ের মুখোমুখি চৌচালা টিনের বাড়ি হলেও মাঝখান দিয়ে পর পর কয়ের স্তরে এমন ভাবে ইট দিয়ে পার্টিশন করা হয়েছে যে,দেখতে বড়ই বেখাপ্পা লাগছে।

বহুকালের শ্যাওলা পরা অবস্থা দেখেই বোঝা যায়,কত পুরনো এই প্রাচীর।
সলিমুল্লাহকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, অনেকটা আমতা আমতা করে উত্তর দেয় পারিবারিক দ্বন্দ্বতো তাই।
নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী সলিমুল্লাহ তার মেয়ে সহ হাজির হন।
নেসার আলী অনেক টা হাসিমুখেই সোমা কে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছো মা?
উত্তরে সোমা আস্তে করে ভালো আছি বলে।

তোমার বাবুটা মাশয়াল্লাহ খুব সুন্দর হয়েছে, আমার কোলে একটু দেবে?বলেন নেসার আলী।
মাথা নেড়ে না বলে সোমা।
হঠাৎ করেই পুরো ঘর অন্ধকার করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় নেসার আলীর হাতের কাছেই রাখা মোমে কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরাতে গেলে চিৎকার করে ওঠে সোমা।

আগুন নিভান, আগুন নিভান আমার বাচ্চা পুইড়া যাইবো,আগুন নিভান বলে ওর সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করতে থাকে।
ঘটনা প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ ব্যতিব্যস্ত হলেও নেসার আলী নির্বিকার ছিলেন কারণ পুরো ঘটনাটিই তাঁর সাজানো ছিল।
মোম নেভানোর সাথে সাথেই বিদুৎ ও চলে আসলো। সোমা অনেক টা আতংকিত ও ঘর্মাক্ত অবস্থায় বাচ্চাটিকে নিয়ে কুঁকড়ে আছে।

নেসার আলী পূর্বেই রাখা পানি ভর্তি গ্লাসটা সোমার দিকে এগিয়ে দিলে, সেটা না খেয়ে হাতে পানি নিয়ে বাচ্চার মুখ, হাত, পা মুছিয়ে দিতে শুরু করে।
অনেকক্ষন নীরবতার পর নেসার আলী সোমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তুমি বাবুটাকে পানি দিয়ে মুছে দিলে কেন?
প্রথমবার,দ্বিতীয়বার উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলে ও তৃতীয়বার বলল
আগুনের তাপ লাগলে শরীল জ্বলে,কষ্ট হয় তাই পানি দিলে আরাম পায়।

নেসার আলীর আরও কিছু প্রশ্নের উত্তরে সোমা শুধু হু হা করেছে।
নেসার আলী সলিমুল্লাহ কে আরেক টি নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে তাকে একা আসতে বললেন।
থমথমে মুখ নিয়ে সলিমুল্লাহ অপেক্ষা করছেন, নেসার আলীর কথা বলার।
নীরবতা ভেঙে নেসার আলী সলিমুল্লাহ কে বললেন, আমি যা জিজ্ঞেস করবো তার সঠিক উত্তর দিবেন।
সলিমুল্লাহ হা সূচক মাথা নাড়লেন।
আপনার স্ত্রীর মৃত্যু কিভাবে হয়েছে?

সলিমুল্লাহ আমতা-আমতা করে বললেন রান্নার সময় শইলে আগুন লাগছিল।
নেসার আলী একটু উচ্চ স্বরেই বললেন, মিথ্যা বলছেন কেন?
আপনার স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় শরীরে আগুন দিয়েছে।
সলিমুল্লাহ কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে আছে।
নেসার আলী বললেন এখন আমি কিছু কথা বলবো, যদি ভুল বলি আপনি আমাকে শুধরে দিবেন।

নেসার আলী বলা শুরু করলেন…
আপনি বিয়ের আগে থেকেই প্রবাস জীবন যাপন করেছেন, মাঝে এসে বিয়ে করে কিছুদিন থেকে আবার বিদেশ চলে যান।
এরই মধ্যে আপনার অল্প বয়েসী স্ত্রী আপনার প্রথম সন্তানের মা হন।
বছর দুয়েক পর আপনি পুরোপুরি ভাবে দেশে চলে আসেন এবং আপনার স্ত্রী কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।
একটা সময় আপনি ব্যবসার পাশাপাশি জামায়াতে যাওয়া শুরু করলেন এবং সপ্তাহে প্রায় চারদিনই বাহিরে থাকতে হতো।
এদিকে আপনার স্ত্রী, দুই সন্তান,আপনার বৃদ্ধা মা এবং আপনার ছোট ভাই একই বাড়িতে থাকতেন।

যতটুকু জানতে পেরেছি একটা সময় আপনার ছোট ভাইয়ের সাথে আপনার স্ত্রীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল।
খুব সম্ভবত এইজন্যই হয়তো আপনার ভাইয়ের সাথে আপনি আর সম্পর্ক রাখেননি।
হঠাৎই একদিন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আপনার অনুপস্থিতিতে দুপুর বেলা আপনার স্ত্রী বাচ্চা দুটো কে ওদের নানির বাসায় রেখে এসে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করেন।

তিনি আর পিছন ফিরে দেখেননি যে তার বাচ্চারা পিছু পিছু ফিরে আসছিল।
বাচ্চারা দরজা ধাক্কাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই যখন ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছিল তখন বাচ্চারা সহ আশেপাশের মানুষ সহ ভয় পেয়ে দরজা ধাক্কানো শুরু করলো।

দরজা খোলার সাথে সাথেই যে দৃশ্য সবাই দেখল,তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।
একটা জলন্ত মানুষ যার শরীরের কাপড় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে শুধু চুলের খোপাটা তে ও জ্বলছিল আগুন।
ঐ অবস্থায় আপনার স্ত্রী চিৎকার করে বলছিল আমার শইলে কাপড় দে,আমার লজ্জা ঢাক,আমার শইলে পানি দে।
তিন দিন অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে আপনার স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঘটেছিল আপনার মেয়ের সামনে।
আপনার মেয়ে সোমা সে-ই ছোট বেলা থেকেই স্মৃতিটা ধারণ করে বেড়াচ্ছে সাথে মা হারানোর কষ্ট তো ছিলই,
কষ্টের তীব্রতা বেড়েছে অর্থাৎ কষ্টটা উপলব্ধি করা শুরু করেছিল ওর বয়ঃসন্ধিকালে।

ওর হরমোনিক কারণে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে ওর স্মৃতি শক্তির প্রখরতায় ওর মায়ের মৃত্যুর পূর্বের কষ্ট টা নিজের শরীরে উপলব্ধি করা শুরু করেছিল।
এই জন্যই সে আগুন দেখলে ভয় পেত এবং সাথে সাথে পানি দিত এই কারণে তার অবচেতন মনে তৈরি হয়ে গিয়েছিল পানি দিলে ওর মা আরাম পেত বা পাবে।

ওর বাচ্চাটিকে ওর জীবনে ওর মায়ের রূপে ফিরে পেয়েছে। বাচ্চাটি কান্না করলেই মনে হয় ওর মায়ের যেমন কষ্ট হয়েছিল বাচ্চাটির ও তেমনই কষ্ট হচ্ছে। তাই সে এমন আচরণ করে।
সলিমুল্লাহ সাহেব আপনার স্ত্রী মারা যাওয়ার তিন মাস পরেই আপনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন এবং সংসার, নতুন সন্তান নিয়ে ভুলে যান সবকিছু।

মেয়েটি বড় হয় মা বাবা ছাড়া ধোঁয়া ওঠা কুন্ডলী পাকানো একটি কালো মেঘ বুকে ধারণ করে।
কখনো কি ওকে সঙ্গ দিয়েছেন? নাকি বন্ধুহীন, নিশ্চুপ জীবনের জটিলতা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছেন?
যখন সমস্যা আপনাদের জীবনে জটিলতা হয়ে ধরা দিল তখন উঠে পরে লাগলেন।

মা বাবা হওয়া যত সহজ, প্রকৃত মা বাবা হয়ে ওঠা তত সহজ নয় বুঝলেন সলিমুল্লাহ সাহেব?
মাথা নিচু করে থাকা নিশ্চুপ সলিমুল্লাহর বহু বছরের বয়ে বেড়ানো কালো মেঘ চোখ দিয়ে বর্ষণ হয়ে কাচের টেবিলের উপর হীরককণা তৈরি করে যাচ্ছিল অবিরাম।

লেখক- জেসমীন আক্তার