Home গদ্য-পদ্য জেসমীন আক্তারের ”অনুভবে অনুরননে”

জেসমীন আক্তারের ”অনুভবে অনুরননে”

109
0
জেসমীন আক্তারের

মিইয়ে গিয়েছিল অনেকটা লজ্জাবতী পাতার মতো, যেদিন প্রথম ভালোবেসে হাত ধরেছিল মেয়েটির।
ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠার সাথে চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কপালে প্রথম উষ্ণ প্রেমাস্পর্শে।
ইচ্ছে করেছিল মেয়েটির পৃথিবীর সমস্ত শব্দকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে শুধু একে অপরের হৃদস্পন্দনের তীব্রতা শুনতে যেদিন প্রথম বাহুডোরে আবদ্ধ হয়েছিল।

চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু বেরিয়ে ছিল দুজন কে সাক্ষী রেখে একে অপরে পাশাপাশি চলার দলিলে সই করে।
নিজেকে ভেঙেচুরে কাদামাটির পুতুলের মতো করে সমর্পনে “গরবিনী সধবার” রাজটিকা পরেছিল কপোলে।
সূর্য উদয়ের রক্তিম আভাকে খান খান করে টুকরো করেছিলো আত্ম চিৎকারের করাঘাতে,নিস্তেজ দেহটিতে প্রাণ এসেছিল নবজাতকের কান্নায়।

মা হওয়ার বিজয়ে সেদিন ও কৃতজ্ঞ চিত্তে চোখে রেখেছিল চোখ।
একপাশে নরম কোমল তুলতুলে শিশুটিকে পরিনত মানবে রূপান্তরের দায়ভার অন্যপাশে ভালোবাসার মানুষটির সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীরে প্রশান্তির প্রলেপ দিতে গিয়ে নিজের নমনীয় শরীর টি কখন যে পুড়ে পুড়ে কঠিন হয়েছে টেরই পায়নি।

হাতে রেখে হাত,পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটার ছন্দ পতনের বিষয়টি মেয়েটির চোখ এড়ালে ও ছেলেটির কিন্তু এড়ালো না।
মাঝে মাঝে শিশির বিন্দুর মতন জমে ওঠা ঘর্মাক্ত লোমশ বুকটিতে নাক মুখ ঘষে শালবনের কচি পাতার গন্ধ খুঁজে কিংবা কানের লতিতে কাঁমড়ে ধরে তাতিয়ে নিতে চেয়েছিল অনুভূতি গুলো কে।
কিন্তু অনুভূতির তানপুরার তার গুলোয় যেভাবেই আঙুলের বিলি কাটা হোক না কেন সেখানে চলছে ছন্দ পতন, কেমন বেসুরো শোনায়।

ছন্দ পতন! এ-ই দায় ছেলেটি নিবে কেন,যার জীবনে ক্ষণে ক্ষণে বসন্তের আনাগোনা!!
কয়েক বছর পর…
একটি নীল খাম!
হ্যাঁ তুমি,
যখন চিঠিটি পড়ছ, তখন আমি কোনো বস্তুগত সম্পদ কিংবা ব্যবহৃত বেনামি কোনো আসবাব অথবা প্রাত্যহিক রোজনামচায় অভ্যস্ততা হয়ে তোমার পাশে আর নেই।

কেনই বা থাকবো বলতো?
আচ্ছা তোমার কি মনে আছে,একদিন হঠাৎ আমার সামনে এসে বলেছিলে…
বাঁচবে আমার সাথে?
রাখবে তোমার পাশে?

ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকটা অবাক ও বিব্রততার মাঝামাঝি তাচ্ছিল্যের হাসিটিতে তুমি প্রচন্ড ভাবে কষ্ট পেয়েছিলে।
যেখানে ভালোবাসার সুরে চারদিকে সয়লাব, সেখানে আবার বাঁচা কি? আমি কি না বেঁচে ছিলাম !
একদিন, দুই দিন, বহুদিন উৎসুক দুটো চোখ আমার চোখের দিকে নীরব আকুতি জানিয়ে গেল,বিনিময়ে পেল শুধুই উদাসীনতা।

হঠাৎ করেই যেভাবে সামনে এসেছিলে,সেভাবেই নাই হয়ে গেলে তুমি।
এবার আমার চোখ দু’টো উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজে ফিরে সেই আকুল মাখানো চোখ,হাজার ভীড়ের মাঝে একটি অবয়ব।
আমার মননে মগজে দিন ক্ষণ সব এক হয়ে যেতে লাগলো। কখনো অবসন্নতা, কখনো বা হৃদ স্পন্দনের তীব্র প্রদাহে অসুস্থ হয়ে যেতে লাগলাম আর উপলব্ধি করলাম,
বাঁচতে হবে, পাশে থাকতে হবে অনুভবে অনুরননে।

হ্যাঁ বেঁচেছিলাম একে অপরের মাঝে অনুভবে।
বৃষ্টি ভেজা, কাদা মাখানো পিচ্ছিল কাঁচা বাঁশের সাঁকোটি তোমার আঙুল ছুঁয়ে পাড় হয়েছিলাম চোখ বন্ধ করে অনেকটা নির্ভয়ে।

আচ্ছা চালতা গাছের ডালে হুতোম পেঁচাটি কি সন্ধ্যার পর এখনো চোখ মেলে বসে,নতুন সাথী কে নিয়ে যখন খুঁনসুটিতে মাতো?

রাত গভীরে বেঁচে থাকার সাধ বাড়ানোর উৎসবে লাজ হীন শালুকেরা ফুটে উঠে পরিবেশটা উৎসব মুখর করে দিত,আমার কিন্তু বেশ লাগতো,এখনো কি দেয়?
আমাকে কি এখনো খোঁজো?
খুব জানতে ইচ্ছে করে।

এমন দিন আসবে,
অফিস ফিরতি পথে রিকশা থামিয়ে খানিকক্ষণ ব্রিজের রেলিঙের পাশে দাঁড়াবে, যেখানে প্রায় সময়ই আমরা সোডিয়াম লাইটের আলোতে অচেনা মুগ্ধতা নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

মুখে তেতো লাগায় আধ খাওয়া সিগারেট পায়ের তলায় পিষে বুকের ভেতরের ভস্মীভূত আগুন নেভানোর ব্যর্থ চেষ্টা করবে।
লাইটের হলুদ আলো ও চোখে জ্বালা ধরাবে,তখন তুমি একটু কষ্ট করে আকাশ পানে তাকিয়ে দেখ,আমি সন্ধ্যা তারা হয়ে জ্বলে থাকবো।তোমার চোখে, মনে প্রশান্তির জন্য।

অফিস ফাইলের বেহিসেবী গরমিল, উত্তেজনায় মাথা দপদপ করছে,খাবার টেবিলে পছন্দের কিছু নেই, প্লেট বাসন ফেলে দেওয়ার ঝনঝন শব্দে ও যখন দেখবে কেউ দৌড়ে আসবে না,
বারান্দার চেয়ারটা টেনে একটু বসো! আমি দখিনা ঝিরঝিরে হাওয়া হয়ে তোমাকে শান্ত করে দিব।

পাশের সঙ্গী বেঘোরে ঘুমুচ্ছে, তোমার চোখে ঘুম নেই,গান শোনায় মন নেই, চোখ দু’টো কিছুক্ষণ বন্ধ করে রেখ,আমি চাঁদ জোৎস্না আড়াল করে না হয় ঝুম বৃষ্টি হয়ে তোমার চোখে ঘুম নামিয়ে দেব।
একইভাবে জানালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো চোখে ফেলে জাগিয়ে তুলবো।
কোনো এক অবসন্ন দুপুরে, ক্লান্ত লাগছে, মন বসছে না কাজে আমি না হয় কালবৈশাখী হয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিব কিছুটা সময়।

যা কাজের হিসেবের মধ্যেই পড়বে না।
ছুটির দিন,সূর্যের নেতিয়ে পরার পায়তারা। কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ,কড়া লিকারের চা আর কবিতার বই ও যখন তোমাকে ঘরে ধরে রাখতে পারছে না।

মনের অজান্তেই যে রাস্তায় আমরা আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে হেঁটে যেতাম সেখানেই পা রাখলে।
একটু অনুভব করে দেখো,আমি না হয় ছায়াবৃক্ষ হয়েই তোমারই পাশে থাকবো।

এভাবেই আমি তোমার মাঝে বেঁচে থাকবো অনুভবে অনুরননে, যেভাবে তুমি আমায় বাঁচতে শিখিয়েছিলে।
আর তুমি অনুভবের উত্তাপে পুড়তে থাকবে বারংবার।
ইতি তোমার অনুভব।

লেখক- জেসমীন আক্তার