Home ক্যাম্পাস ও শিক্ষা একজন ইয়াসমিন মোর্শেদ – একটি বিস্তৃত জীবনী

একজন ইয়াসমিন মোর্শেদ – একটি বিস্তৃত জীবনী

369
0
একজন ইয়াসমিন মোর্শেদ

ইয়াসমিন মোর্শেদ ছিলেন বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজসেবা ও কূটনীতির জগতে এক উজ্জ্বল নাম। একজন প্রগতিশীল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্কলাস্টিকা স্কুল, যা দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইয়াসমিন মোর্শেদ দায়িত্ব পালন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে। পাশাপাশি, কূটনৈতিক ভূমিকায় তিনি ২০০৭ সালে পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন।

সমৃদ্ধ পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত মেধা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ছিলেন। তার জীবন ছিল নীরব কর্মের মাধ্যমে সমাজ বদলের এক অনন্য অনুশীলন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা, সাবেক উপদেষ্টা, ও কূটনীতিক

ইয়াসমিন মোর্শেদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং কূটনীতিক। তিনি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় অগ্রদূত হিসেবে স্কলাস্টিকা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একইসাথে তিনি ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৭ সালে পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান।

পারিবারিক পটভূমি ও জন্ম

ইয়াসমিন মোর্শেদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৯ মে, ভারতের কলকাতায় (তৎকালীন বেঙ্গল প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত)। তার পিতা ছিলেন খাজা জাকিউদ্দিন এবং মাতা বেগম বিনু।

তার দাদা খাজা শাহাবুদ্দিন ছিলেন পাকিস্তানের নর্থওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের গভর্নর এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী। তার দাদী ফারহাত বানু ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।

মায়ের পরিবার বগুড়ার, এবং তার মামা হাবিবুর রহমান ছিলেন ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।

একজন ইয়াসমিন মোর্শেদ

শিক্ষা

তিনি তার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল, ঢাকা থেকে। পরবর্তীতে স্বামীর কর্মস্থল পাকিস্তানের লাহোর ও ইসলামাবাদে অবস্থানকালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

পেশাগত জীবন ও অর্জন

স্কলাস্টিকা স্কুল: ১৯৭৭ সালে তিনি স্কলাস্টিকা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন।

Etcetera Bangladesh: তিনি এই লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন স্টোরের চেয়ারপারসন ছিলেন।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (IUB): তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি এবং গভার্নিং কাউন্সিলের সদস্য।

ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

একজন ইয়াসমিন মোর্শেদ

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা: ৩১ অক্টোবর ২০০৬ থেকে ১১ জানুয়ারি ২০০৭ পর্যন্ত তিনি নারী ও শিশু বিষয়ক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার (পাকিস্তান): ২০০৭ সালে তিনি পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সৈয়দ তানভীর মোর্শেদের সঙ্গে, যিনি ছিলেন সৈয়দ মঞ্জুর মোর্শেদ ও বেগম হাছিনা মোর্শেদ-এর কনিষ্ঠ পুত্র। তানভীর মোর্শেদ মারা যান ১৯৮৮ সালে।

তাদের দুই সন্তান—সৈয়দ মাহের মোর্শেদ এবং সৈয়দা মাধিহা মোর্শেদ। মাধিহা বর্তমানে স্কলাস্টিকা স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

তানভীর মোর্শেদ ছিলেন প্রখ্যাত বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ-এর ভ্রাতুষ্পুত্র।

মৃত্যু

ইয়াসমিন মোর্শেদ ৩১ জুলাই ২০২৫, রাত ৮টা ৩১ মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় আজাদ মসজিদে, বাদ জুমা, এবং দ্বিতীয় জানাজা হয় স্কলাস্টিকা স্কুলের উত্তরা শাখায়। পরে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ইয়াসমিন মোর্শেদের জীবনব্যাপী অবদান শিক্ষা, সমাজসেবা এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি একাধারে একজন দূরদর্শী নারী, সংগঠক, শিক্ষানুরাগী ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।

তার প্রয়াণে জাতি হারাল একজন আদর্শ নারী নেতৃত্বকে।