Home গণমাধ্যম সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর; জ্বলছে নথি, নিভছে ন্যায়বিচার

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর; জ্বলছে নথি, নিভছে ন্যায়বিচার

332
0
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ারমেহেরুন রুনির নির্মম হত্যাকাণ্ড।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে রাজধানীর ভাড়া বাসায় তাঁদের হত্যার খবর যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ন্যায়বিচারের আশা নিয়ে শুরু হয়েছিল বহু কথা, বহু প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আজ, বারো বছর পেরিয়ে এসেও — বিচার নেই।

এক যুগেরও বেশী সময় পেরিয়েও অন্ধকারের ভেতর হারিয়ে গেছে বিচারের আশা
নথি পুড়েছে, বলে রাষ্ট্রপক্ষ।
মিথ্যা বলা হচ্ছে, বলে পুলিশ।
আর জনগণ বছরের পর বছর শুনছে — প্রতিশ্রুতি আর প্রহসনের করুণ গল্প।

উইকিপিডায়াতেও যেখানে লেখা–

সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড (সাগর-রুনি হত্যা মামলা নামেও পরিচিত) হল ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, যেখানে প্রখ্যাত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি তাদের পেশাগত দৃঢ় কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকায় নিজ বাসভবনে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত কর্তৃক উভয়েই ছুরিকাঘাতে নিহত হন। মামলাটি এখনও চলমান রয়েছে।

বিডিআর হত্যাকান্ড সম্পর্কে আওয়ামীলীগ ও ভারতের সংশ্লিষ্টতার গোপন তথ্য তাদের কাছে থাকার কারনে পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করা হয় বলে অনেক আগে থেকেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এমপি শাওনের কিলার বাহিনী দিয়ে, বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে সাগর-রুনি হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার প্রমান সম্প্রতি মিলেছে ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে।

সেখানে তাদের বিচার নিয়ে কত গড়িমসি হয়েছে হচ্ছে।

আজ যখন জাতি নতুন নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, তখন সাগর-রুনির মুগ্ধ পুত্র মেহের সারওয়ার মুগ্ধ নিজের হারানো শৈশবের বিচার চেয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।
কোন রাষ্ট্র তার শিশুর কাছেও এই অন্যায় করতে পারে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হলো বিচারপ্রাপ্তি। যেখানে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না, সেখানে বাকস্বাধীনতা থাকে কাগজে-কলমে। বাস্তবে, ন্যায়বিচার আর নিরাপত্তা — দুটোই হারিয়ে যায়। সাগর-রুনি হত্যার বিচারহীনতা আমাদের সামনে সেই ভয়ংকর বাস্তবতাই খুলে দিয়েছে।

এক শিশুর ছিনতাই করা শৈশব

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো তাঁদের ছোট্ট ছেলে, মেহের সারওয়ার মুগ্ধ

যখন একজন শিশু শৈশবে বাবা-মায়ের উষ্ণ হাতের ছায়ায় বড়ো হওয়ার কথা, তখন মুগ্ধকে বড় হতে হয়েছে শূন্যতায়। তার শৈশব, তার হাসি, তার নির্ভরতার পৃথিবী এক রাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল কিছু পিশাচ। আজও মুগ্ধের জন্য কেউ ন্যায়বিচার এনে দিতে পারেনি।

একজন শিশুর থেকে তার বাবা-মায়ের ভালবাসা কেড়ে নেওয়ার পাপ শুধু পার্থিব নয় — এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এবং এই অপরাধের বিচারহীনতা একটি জাতির গায়ে কলঙ্কের দাগ হয়ে থাকে।

সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব

গোটা সাংবাদিক সমাজ এ ঘটনা নিয়ে বহুবার প্রতিবাদ করেছে। ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছে, মানববন্ধন করেছে, দিনের পর দিন লিখে গেছে।

কিন্তু এসব প্রচেষ্টা টুকরো টুকরো থেকে গেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অনীহা আর বিচারহীনতার দেয়াল ভাঙার জন্য প্রয়োজন ছিল একসঙ্গে এক কণ্ঠে, নিরলস লড়াই। আজও সেটা দরকার তবে আরও বেশি।

“সাংবাদিক সংগঠন তো অনেক, প্লেকার্ড নিয়ে বছরে ১/২ বার দাড়িয়ে প্রতিবাদ, এটা কতটুকু কাজের? সেটা গত ১২  বছরে দেখা গেছে। কোন কোন সাংবাদিক নেতা তাদের প্রতিবাদের মাধ্যমে হয়েছেন টাকা ও ক্ষমতার মালিক। কিন্তু সাগর-রুনির বিচার আর হলো না।

সকল সংগঠনকে এক কাতারে এসে বিচারের জন্য প্রতিবাদ করতে হবে নিজ স্বার্থ বাদ দিয়ে।”

 সাগর-রুনির বিচারের প্রশ্নটি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত নয়, এটি আমাদের সবার বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন।

সাংবাদিকরা যদি আজ এক কণ্ঠে, শক্ত অবস্থানে না দাঁড়ান, তাহলে এই বিচারহীনতার শিকল আগামীর সত্য বলার কণ্ঠগুলোকে আরও শক্তভাবে বেঁধে ফেলবে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা: প্রতিশ্রুতি নয়, কাজ চাই

রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তার দায় এড়াতে পারে না। বারবার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন, বারবার সময়ক্ষেপণ, আর অবাস্তব অজুহাত জনগণের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা চাই দৃশ্যমান অগ্রগতি।
আমরা জানতে চাই —
কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ডের নথি “পুড়ে যায়”?
কীভাবে তদন্ত এত বছরেও শেষ হয় না?
কীভাবে রাষ্ট্রের চোখের সামনে হত্যাকারীরা অদৃশ্য থাকে?

এখন সময় — এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার। সময় — হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর।

আরও পড়ুন- “ভারতের গণমাধ্যমে মুখরোচক মিথ্যাচারের মলম বিক্রী”

একটি জাতির আত্মমর্যাদার পরীক্ষা

সাগর-রুনির বিচার না হওয়া মানে শুধু দুটি প্রাণের ন্যায়বিচার না পাওয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনারও মারাত্মক ব্যর্থতা।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কোন উদাহরণ রেখে যাচ্ছি?

আমরা আর অপেক্ষা করতে চাই না।
আমরা আর শোক আর হতাশায় মুড়ে থাকতে চাই না।
আমরা ন্যায়বিচার চাই — এখনই।

✍️
মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান সম্পাদক
enewsup.com (ইনিউজ আপ ডট কম)