রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হওয়া যুদ্ধ বিমান একটি এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট হালকা ওজনের যুদ্ধবিমান।
এই বিমান নির্মাণ করে চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (CAC)। চীনে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য বিমানটি J-7 নামে পরিচিত হলেও, রপ্তানির সময় এটি F-7 নামে রফতানি করা হয়।
কোন দেশ তৈরি করে?
এটি তৈরি করে চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি) । যা MiG‑21-এর লাইসেন্স ভিত্তিক সংস্করণ J‑7 থেকে উদ্ভূত F‑7 সিরিজ তৈরি করে। এটি 1965 থেকে 2013 সাল পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশের মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সূত্র: (Wikipedia
Hindustan Times)
এফ-৭ জেটের প্রযুক্তিগত দিক
F-7 বা Chengdu J-7 একটি হালকা ওজনের, একক ইঞ্জিনযুক্ত সুপারসনিক যুদ্ধবিমান, যা মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের MiG-21 ভিত্তিক চীনা সংস্করণ। এটি ১৯৬৫ সালে প্রথমবার আকাশে উড়ে এবং পরে বিভিন্ন দেশের জন্য রপ্তানি উপযোগী সংস্করণ তৈরি করা হয়।
প্রধান প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য:
ইঞ্জিন:WP-13 বা WP-7B টার্বোজেট ইঞ্জিন (MiG-21 থেকে অনুপ্রাণিত)।
উন্নত সংস্করণে AI-23 উন্নত সেন্সর ব্যবস্থাও যোগ হয়েছে।
গতি:সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২.০ (দ্রুতগতিসম্পন্ন)
উচ্চতা:সর্বোচ্চ অপারেটিং উচ্চতা ১৭,৫০০ মিটার পর্যন্ত।
অস্ত্রসজ্জা: ২টি ৩০ মিমি গান
ইনফ্রারেড বা রাডার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র (PL-5, PL-7, বা AIM-9 টাইপ)
বোমা বা রকেট লঞ্চার বহনে সক্ষম
অভ্যন্তরীণ সরঞ্জাম:
রাডার: KLJ-6E Fire Control Radar (F-7BGI তে)
HUD (Head-up Display)
GPS-ভিত্তিক ন্যাভিগেশন
সীমিত বেয়নেট জ্যামার ও কমিউনিকেশন সিস্টেম
F-7 জেটের সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি
যদিও F-7 সাশ্রয়ী এবং বহু দেশে ব্যবহৃত একটি যুদ্ধবিমান, তবে এতে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
1. পুরনো ডিজাইন ও প্রযুক্তি
বিমানটির মূল কাঠামো ১৯৫০-এর দশকের ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে।
আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় এর ইলেকট্রনিক ও অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম অনেক সীমিত।
2. একক ইঞ্জিন নির্ভরতা
একমাত্র ইঞ্জিন থাকায় ইঞ্জিন বিকল হলে ইজেকশন ছাড়া বিকল্প থাকে না।
ইঞ্জিন ও তেলের সমস্যা F-7 বিধ্বস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
3. সীমিত রাডার ও অস্ত্রসজ্জা
রাডার কভারেজ সীমিত, এবং অনেক সময় প্রতিপক্ষ শনাক্তে বিলম্ব ঘটে।
ভারী অস্ত্র বহনের সক্ষমতা নেই, ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বহুমুখী কার্যকারিতা কম।
4. নিম্ন মানের ককপিট প্রযুক্তি (পুরনো সংস্করণে)
পুরনো সংস্করণগুলোর ককপিট ডিজাইন অপর্যাপ্ত এবং কিছু ম্যানুয়াল নির্দেশনাভিত্তিক।
জটিল পরিস্থিতিতে পাইলটদের প্রতিক্রিয়া দেওয়া কঠিন হয়।
5. নিরাপত্তা ত্রুটি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি
অনেক দুর্ঘটনা হয়েছে ইঞ্জিন বিকল, রাডার লক ফেল, বা পাখার কার্যক্ষমতা হ্রাস-এর কারণে।
প্রশিক্ষণের সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে, কারণ এটি উচ্চ গতিতে নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে।
আগের দুর্ঘটনাগুলো (বাংলাদেশ ও বিশ্বের):
আজকের দুর্ঘটনা – ২১ জুলাই ২০২৫, ঢাকা
F‑7 BGI প্রশিক্ষণ জেট ঢাকার উত্তরায় Milestone School & College ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। সহপাঠীদের মধ্যে ২০ জন নিহত, এবং ১৭১ জন আহত। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য।
২৩ নভেম্বর ২০১৮, টাঙ্গাইল (মধুপুর)
BAF-এর একটি F‑7BG প্রশিক্ষণ ফ্লাইটে ইঞ্জিন ট্যাঙ্কে আগুন ধরে ফেলে, পাইলট ইজেক্ট করেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিহত হন। সূত্র: (Bloomberg.com,Wikipedia)।
৮ জুন ২০০৫, কক্সবাজার/উত্তরা
একটি F‑7 প্রশিক্ষণ ফ্লাইট জনবসতির নিকট এসে বিধ্বস্ত হয়। পাইলট ইজেক্ট করে রক্ষা পান, কিন্তু জনসমষ্টির বাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়
Wikipedia
।
- ২০০৮ (Tangail‑এর পাশ্ববর্তী অঞ্চল)
২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাহাড়িপাড়া গ্রামে একটি এফ-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান পাইলটসহ বিধ্বস্ত হয়। এতে স্কোয়াড্রন লিডার মোর্শেদ হাসান নিহত হন। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সে সময় সম্ভাব্য কারিগরি ত্রুটিকে দায়ী করা হয়েছিল। (সূত্রঃ Cadena SER, Wikipedia,Reuters)।
অন্যান্য দেশেও দুর্ঘটনা:
২০০৮–২০১৫ পর্যায়ে চীন, পাকিস্তান (FT‑7), নাইজেরিয়া, সুদান ইত্যাদি দেশে একাধিক F‑7 / J‑7 বিধ্বস্ত ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। (সূত্রঃ Reuters,Wikipedia,Hindustan Times)।
F-7 তার সময়ের একটি কার্যকরী যুদ্ধবিমান হলেও, আধুনিক প্রযুক্তির তুলনায় এটি এখন অনেকটাই পিছিয়ে। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে এই বিমান বড় ধরনের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক বিকল্প প্রয়োজন।









