জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করা হবে। এর অর্থ হলো, জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে এই গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এতে সংস্কার কার্যক্রমের লক্ষ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না, বরং নির্বাচন আরও বেশি উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।গণভোট আয়োজনের জন্য উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঐকমত্য কমিশনের সফলতা ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত প্রায় নয় মাস ধরে নিরলসভাবে কাজ করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে তারা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনেক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত ‘জুলাই সনদ’-এ সংবিধান বিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যা একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তিনি ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়া সফল করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মতের পার্থক্য থাকলেও তা গভীর নয়; মূলত কেউ সংস্কার সংবিধানে, আবার কেউ আইনের মাধ্যমে করতে চেয়েছেন, কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে কারও মধ্যে মতভেদ নেই।
‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন
রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে মূল দলিল হিসেবে ধরে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আজকের (বৃহস্পতিবার) উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করেছে। প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর শেষে এটি গেজেট নোটিফিকেশন করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা একটি বিরাট খবর।
এই আদেশে সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান গ্রহণ করা হয়েছে।
গণভোটের একক প্রশ্ন ও চারটি মূল বিষয়
জুলাই সনদের আলোকে গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্নটি প্রধান উপদেষ্টা জাতির সামনে তুলে ধরেন। এটি হবে একটিমাত্র প্রশ্ন, যেখানে ভোটারদেরকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে।
গণভোটের প্রশ্নটি হলো:
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
এই একক প্রশ্নের অধীনে চারটি মূল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
ক) নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা: তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) ৩০টি সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা: সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর যে ৩০টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) অন্যান্য সংস্কার: জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
‘হ্যাঁ’ ভোটে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে, আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংস্কার সম্পন্ন হবার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত থাকবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও অনুমোদিত আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
— নিউজ ডেস্ক








