রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদরদপ্তরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্ণ হলো আজ। ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই ভয়ংকর ঘটনার বিচার আজও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই মামলার বিচারে যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা।
শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা আসামি হওয়ার প্রক্রিয়ায়
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সাহারা খাতুন, শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাদের নতুন করে আসামি করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
“আমরা বিডিআরের ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনঃতদন্ত করব অথবা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমরা দায়বদ্ধ।” — সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা: বড় দুই বাধা
পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে হওয়া দুটি মামলার অবস্থা বর্তমানে নিম্নরূপ:
- হত্যা মামলা: ২০১৩ সালে বিচারিক আদালত ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড দিলেও ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের সাজা বহাল রাখেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় আছে।
- বিস্ফোরক মামলা: ঢাকার আদালতে এই মামলার বিচার বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে স্থবির হয়ে আছে। ১,২০০ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৩০২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমান গতিতে চললে এটি শেষ হতে আরও ২০ বছর লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আইনজীবীরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কি বিচার হবে?
পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) বিচারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যদি এটি আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় পড়ে, তবে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি এখানেও বিচার হতে পারে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের টাইমলাইন (এক নজরে)
| সাল | ঘটনা |
| ২০০৯ | ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় নৃশংস বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড। |
| ২০১৩ | বিচারিক আদালতে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদান। |
| ২০১৭ | হাইকোর্টে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল। |
| ২০২৪ | রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন। |
| ২০২৬ | পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর; শেখ হাসিনাকে আসামি করার প্রস্তুতি। |
আজকের কর্মসূচি
পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭তম বার্ষিকীতে বনানী সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ। পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
শেষ কথা: পিলখানার স্বজনহারা পরিবারগুলোর ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কি এবার হবে? নতুন তদন্ত এবং প্রভাবশালী আসামিদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।







