রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—দেশজুড়ে এক ভয়ঙ্কর অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে। হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া বিল, মিটার না দেখে গড় হিসাবের বিল, অনলাইন অভিযোগে হয়রানি—সব মিলিয়ে সাধারণ গ্রাহকের জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
ঢাকার কাফরুল এলাকার বাসিন্দা আলিফ প্রতিমাসে ২,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতেন। আয় কম, তাই সাবধানে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। কিন্তু অক্টোবর মাসে বাড়িওয়ালা ভাড়ার রিসিটের সঙ্গে ধরিয়ে দিলেন ৯,০০০ টাকার বিল! হতবাক আলিফ বলেন,
“কীভাবে এত বিল এলো? আমি প্রতিবাদ করলে বাড়িওয়ালা জানালেন—বিল দিয়ে গেছে, কোন মাসে আসে কোন মাসে আসে না, আমরা কি করবো? মুখস্ত বিল। আমি বলেছি, এই অন্যায্য বিল আমি দেব না।”
আলিফ মিরপুরের ডেসকো অফিসে লিখিত অভিযোগ দিতে গেলেও তা জমা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। বলা হয়, “অনলাইনে অভিযোগ দিন।” কিন্তু অনলাইন ফর্মে বাড়িওয়ালার আইডি প্রয়োজন, আর সার্ভারও বারবার এরর দেখায়। শেষমেশ ডেসকো হেড অফিসে ইমেইল করে অভিযোগ জমা দিয়েছেন আলিফ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন—“সমাধান না হলে আমি বিল দেব না। অন্যায় বিল কেন দেব?”
ডেসকোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো পদক্ষেপ বা প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
গ্রামেও একই চিত্র—অযৌক্তিক বিলের ছোবলে হতভম্ব মানুষ
মহেশপুরের আজমপুরের দিনমজুর খোকন বিশ্বাসের ছোট্ট টিনের ঘরে দুটি ফ্যান, দুটি বাল্ব, একটি ফ্রিজ। অথচ হাতে এসেছে ৩৩,৪৫০ টাকার বিল!
(সূত্র: সময় নিউজ, ২৩ অক্টোবর ২০২৫)
খোকন বলেন,
“আমাদের ব্যবহার তো আগের মতোই, তবু বিল এলো লাখপতির মতো! এখন কীভাবে দেব এত টাকা?”
ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামে একই অবস্থা—কারও ১,০০০ টাকার জায়গায় ৮,০০০, কারও ৩,০০০ টাকার জায়গায় ১৫,০০০ টাকার বিল। গ্রাহকদের অভিযোগ—মিটার রিডিং না নিয়ে গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হচ্ছে।
কুমিল্লার ছোটরা কলোনিতে তানজীদা আক্তার রিয়ার ঘরে আগস্ট মাসে বিল ছিল ১,৪০০ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে এক লাফে এসে গেছে ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা!
(সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বিদ্যুৎ অফিস বলেছে, “ভুলে হয়েছে।” কিন্তু এখনো প্রতিকার নেই।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বিদ্যুৎ বিল এসেছে দ্বিগুণ থেকে পাঁচ–ছয় গুণ বেশি। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, ডিজিটাল কারচুপিতে তারা অসহায়।
(সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ, ৩০ অক্টোবর ২০২৫)
কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকদের অভিযোগ—রিডাররা মিটার না দেখে গড় হিসাব ধরছেন। ২০০ টাকার জায়গায় ১,২০০ টাকার বিল!
(সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩০ অক্টোবর ২০২৫)
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফ্রিজ বা টিভি না থাকা সত্ত্বেও এসেছে ৪,০৩৩ টাকার বিল।
(সূত্র: ইত্তেফাক, ০৭ অক্টোবর ২০২৫)
দিনাজপুরের হাকিমপুরে খামারি রাজু আহম্মেদের অভিযোগ—“আগে ৬ হাজার টাকার বিল আসত, এখন ১২ হাজার টাকার বেশি। অভিযোগ করলেই উল্টো অশোভন আচরণ করে বিদ্যুৎ অফিস।”
(সূত্র: সমকাল, ২৮ অক্টোবর ২০২৫)
⚡ এক প্রশ্ন—মানুষ ভাত খাবে না বিদ্যুৎ বিল দেবে?
ডেসকো থেকে শুরু করে পল্লী বিদ্যুৎ—প্রিপেইড বা পোস্টপেইড, সব মাধ্যমেই চলছে গলাকাটা বিলিং পদ্ধতি।
সাধারণ মানুষ আজ প্রশ্ন তুলছে,
“এই দেশে কি বিদ্যুৎ বিলের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? ভুলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে এত বিল আসে, তবু কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই কেন?”
সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রতি স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি।
অন্যায্য বিল আর হয়রানির কবল থেকে মানুষ মুক্তি পাবে কবে—এটাই এখন কোটি ভোক্তার প্রশ্ন।
নিজস্ব প্রতিবেদক │ ই-নিউজআপ ডট কম







