যশ (Yash)। কর্ণাটকের এক অজপাড়াগাঁয়ের বাস ড্রাইভারের ছেলে আজ গোটা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম শক্তিশালী নাম।
‘কেজিএফ’-এর রকি ভাই থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘টকসিক’-এর চরিত্রে, যশ (Yash) প্রমাণ করে দিয়েছেন যে প্রতিভা আর অধ্যাবসায় থাকলে সীমান্ত, ভাষা কিংবা আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কোনো কিছুই বাধা হতে পারে না।
আসুন জেনে নেই কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির এই রকিং স্টারের জীবন ও কর্মের পুরো গল্প।
সংক্ষিপ্ত পরিচয়: নবীন কুমার গৌড় থেকে ‘যশ’
যশের প্রকৃত নাম নবীন কুমার গৌড়। কর্ণাটকের হাসান জেলার এক ছোট্ট গ্রামে সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম।
বাবা অরুণ কুমার পেশায় ছিলেন একজন সরকারি বাস ড্রাইভার, কর্ণাটক রাজ্য সড়ক পরিবহন সংস্থা এবং পরে বেঙ্গালুরু মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনে দীর্ঘদিন গাড়ি চালিয়েছেন।
মা পুষ্পা ছিলেন গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটেও স্বচ্ছল ছিল না, বরং প্রতিটা দিন ছিল সংগ্রামের।
ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল নবীনের।
স্কুলে ফ্যান্সি ড্রেস প্রতিযোগিতায় পুলিশের সাজে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন মাত্র তিন বছর বয়সে, সেই ঘটনাই যেন তাঁর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন ছেলে একটা স্থায়ী সরকারি চাকরি করুক, অভিনয়ের মতো অনিশ্চিত পেশায় নয়। পরিবারের এই দ্বিমতের বিরুদ্ধেই নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নবীন।

টিভি সিরিয়াল থেকে সিনেমায় লড়াই
মাত্র ষোলো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে পাড়ি জমান নবীন, লক্ষ্য একটাই, কন্নড় ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা করে নেওয়া।
শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমে একটি চলচ্চিত্র প্রজেক্টে বিনাবেতনে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন, কিন্তু সেই প্রজেক্ট মাত্র দুই দিনেই বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর একটি থিয়েটার দলে ব্যাকস্টেজ সহকারী হিসেবে কাজ করেন, ধীরে ধীরে সেখান থেকেই স্ট্যান্ড-ইন অভিনেতার ভূমিকায় আসেন।
থিয়েটারের পাশাপাশি কন্নড় ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ করে সামান্য উপার্জন করতেন। এই সংগ্রামের দিনগুলোতে বহুবার হতাশ হয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি।
একটা সময় সুযোগ আসে টেলিভিশনে, ‘উত্তরায়ণ’ ধারাবাহিক দিয়ে ছোট পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর।
এরপর ‘নন্দ গোকুলা’সহ আরও কয়েকটি ধারাবাহিকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
আরো পড়ুন- প্রভাস: আধুনিক দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার
টেলিভিশনে কাজ করার সময়েই সহকর্মীরা তাঁকে পরামর্শ দেন আসল নাম বাদ দিয়ে একটি সহজ ও আকর্ষণীয় স্ক্রিন নাম বেছে নিতে। ছোটবেলার ডাকনাম ‘যশ’ নিয়েই তিনি পথ চলা শুরু করেন, যে নাম আজ কোটি কোটি দর্শকের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক।

কন্নড় ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা
২০০৮ সালে ‘মোগিনা মনসু’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় প্রকৃত পরিচিতি পান যশ। এই ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডও জিতে নেন তিনি, যা তাঁর অভিনয় জীবনের প্রথম বড় স্বীকৃতি।
একই বছর মুখ্য চরিত্রে অভিনীত ‘রকি’ সিনেমাটি অবশ্য বক্স অফিসে সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি, সমালোচকদের কাছেও তেমন প্রশংসা পায়নি।
তবে হাল ছাড়েননি যশ। একের পর এক সিনেমায় কাজ করে নিজের অভিনয় দক্ষতা প্রমাণ করতে থাকেন।
২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কলেজ রোমান্টিক ধাঁচের সিনেমা ‘গুগলি’ এবং কমেডি-ড্রামা ‘রাজা হুলি’ দিয়ে ধীরে ধীরে কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ তারকাদের কাতারে নিজের নাম লেখান।
এরপর ২০১৪ সালে ফ্যান্টাসি অ্যাকশন ঘরানার ‘গজকেসরি’ এবং একই বছরের রোমান্টিক কমেডি ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামচারী’ তাঁর ক্যারিয়ারে দুটি বড় মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামচারী’ তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেতার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, আর ছবিটি হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ আয়কারী কন্নড় সিনেমাগুলোর একটি।
এই সময়ে সহ-অভিনেত্রী রাধিকা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে বিয়েতে রূপ নেয়। ধীরে ধীরে কন্নড় সিনেমার সবচেয়ে বাণিজ্যিকভাবে সফল ও জনপ্রিয় মুখে পরিণত হন যশ, ভক্তরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকতে শুরু করেন ‘রকিং স্টার’ নামে।
‘কেজিএফ’ এবং বিশ্বজুড়ে তোলপাড়
২০১৮ সালে মুক্তি পায় পরিচালক প্রশান্ত নীলের ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ওয়ান’। রকি ভাই চরিত্রে যশের পারফরম্যান্স রাতারাতি গোটা ভারতে তাঁকে পরিচিত করে তোলে।
সোনার খনির অপরাধ জগতের এক রহস্যময় নায়কের গল্প বলা এই সিনেমা ভাষার সীমানা ভেঙে দর্শকদের মন জয় করে নেয়। এই ছবির জন্য যশ দ্বিতীয়বারের মতো সেরা অভিনেতার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন।
কিন্তু আসল ইতিহাস তৈরি হয় ২০২২ সালে, ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার টু’ মুক্তির মধ্য দিয়ে। এই সিনেমা মুক্তির প্রথম দিনেই ভারতীয় বক্স অফিসে ঝড় তোলে, এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২৫০ কোটি রুপি আয় করে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আয়কারী ভারতীয় সিনেমার তালিকায় জায়গা করে নেয়।
হিন্দি বলয়েও এই ছবি প্রথম সপ্তাহেই আড়াইশো কোটি রুপির মাইলফলক অতিক্রম করে, যা তখনকার সময়ে বিরল এক কীর্তি।
‘কেজিএফ’ ফ্র্যাঞ্চাইজি শুধু যশের ক্যারিয়ারই বদলে দেয়নি, বরং গোটা কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সিনেমার মাধ্যমেই ভারতীয় দর্শকরা ‘প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমা’ ধারণার সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে পরিচিত হন।
রাতারাতি যশ হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল তারকাদের একজন, বলিউডের বহু প্রথম সারির তারকার সঙ্গে যাঁর তুলনা চলতে থাকে সমানে সমানে।

নতুন ধামাকা ‘টকসিক’: চার বছরের অপেক্ষার অবসান
‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার টু’-এর পর দীর্ঘ চার বছরের প্রতীক্ষার পালা শেষে গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ মুক্তি পেয়েছে যশের বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘টকসিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোনআপস’।
পরিচালক গীতু মোহনদাসের হাত ধরে তৈরি এই গ্যাংস্টার ড্রামায় দ্বৈত চরিত্রে দেখা গেছে যশকে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী গোয়ার পটভূমিতে আবর্তিত হওয়া এই গল্পে আনুগত্য, নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত মুক্তির লড়াই ফুটে উঠেছে, যেখানে সহশিল্পী হিসেবে রয়েছেন কিয়ারা আদভানি, নয়নতারা, হুমা কুরেশি, রুক্মিণী বসন্ত, তারা সুতারিয়াসহ আরও অনেকে।
মুক্তির প্রথম দিনেই ভক্তদের মধ্যে দেখা গেছে তুমুল উন্মাদনা। হিন্দি, কন্নড়, মালয়ালম, তামিল ও তেলুগু, মোট পাঁচটি ভাষায় একযোগে মুক্তি পাওয়া এই আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকশন প্রজেক্টটি প্রথম দিনেই ভারতে ১০০ কোটি রুপির নেট কালেকশন অতিক্রম করে ফেলে।
বিশ্বজুড়ে প্রথম দিনের মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৪০.৭৫ কোটি রুপিতে, যা প্রমাণ করে যশের প্রতি দর্শকদের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে।
‘টকসিক’-এর অ্যাকশন সিকোয়েন্স, সিনেমাটোগ্রাফি এবং যশের ভিন্নধর্মী লুক নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
যদিও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র, তবু বক্স অফিসে ছবিটির এই বিশাল সূচনা আরও একবার প্রমাণ করেছে যে যশ এখন আর শুধু কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির তারকা নন, তিনি সত্যিকার অর্থেই এক প্যান-ইন্ডিয়ান সুপারস্টার।
ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজসেবা
পর্দার বাইরে যশের ব্যক্তিগত জীবনও কম আকর্ষণীয় নয়। ‘মোগিনা মনসু’ সিনেমার সেট থেকে শুরু হওয়া সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০১৬ সালে বিয়ে করেন সহ-অভিনেত্রী রাধিকা পণ্ডিতকে।
এই দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে, কন্যা আয়রা এবং পুত্র যাথার্ভ। ব্যস্ত অভিনয় জীবনের পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেওয়ার ব্যাপারে যশ সবসময়ই সচেতন থেকেছেন, যা তাঁকে ভক্তদের কাছে আরও কাছের মানুষ করে তুলেছে।

২০১৭ সালে স্ত্রী রাধিকা পণ্ডিতের সঙ্গে মিলে যশ প্রতিষ্ঠা করেন যশোমার্গ ফাউন্ডেশন, যা মূলত জলসংরক্ষণ, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত।
এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কর্ণাটকের কোপ্পাল জেলায় শুকিয়ে যাওয়া বহু হ্রদ পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে, বহু গ্রামে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কালাবুরাগি ও বিজাপুরের মতো খরাপ্রবণ অঞ্চলে ট্যাংকারের মাধ্যমে পানীয় জল সরবরাহ, কোদাগু জেলার বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো, করোনাকালে বিপর্যস্ত কন্নড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান,
এবং প্রয়াত অভিনেতা পুনীথ রাজকুমারের স্মৃতিতে গ্রামাঞ্চলে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করার মতো একাধিক মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে এই ফাউন্ডেশন।
শুধু বিনোদন জগতের তারকা নন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ এক মানুষ হিসেবেও যশ নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন।

অর্জন ও রেকর্ড
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে যশের ঝুলিতে জমা হয়েছে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।
তিনটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ এবং পাঁচটি সাইমা অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছেন এই তারকা, যা দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি।
বক্স অফিসেও একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার টু’ আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমাগুলোর তালিকায় জায়গা ধরে রেখেছে,
একইসঙ্গে কন্নড় সিনেমার মুক্তির দিনের সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ডও এখনও তাঁরই দখলে।
সাম্প্রতিক ‘টকসিক’ সিনেমাও মুক্তির প্রথম দিনেই একাধিক বলিউড ব্লকবাস্টারের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা আরও একবার প্রমাণ করে বক্স অফিসে যশের অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য।

উপসংহার
একজন সাধারণ বাস ড্রাইভারের ছেলে, যাঁর পরিবারে ছিল না চলচ্চিত্র জগতের কোনো পরিচিতি বা যোগাযোগ,
আজ সেই মানুষটিই ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতিপথ বদলে দেওয়া এক সুপারস্টার।
থিয়েটারের ব্যাকস্টেজ থেকে টেলিভিশন ধারাবাহিক, সেখান থেকে কন্নড় সিনেমার শীর্ষ তারকা,
আর অবশেষে ‘কেজিএফ’ ও ‘টকসিক’-এর মতো সিনেমার মধ্য দিয়ে সমগ্র দেশের সুপারস্টার হয়ে ওঠা।
যশের এই যাত্রা প্রতিটি সংগ্রামী মানুষের কাছেই এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
শূন্য থেকে শুরু করে আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন নবীন কুমার গৌড় ওরফে যশ, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং গোটা কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পকে বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ও বটে।
রকিং স্টার যশের এই যাত্রা এখনও শেষ হয়নি, বরং প্রতিটি নতুন সিনেমার সঙ্গে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন, কেন তিনি সত্যিকার অর্থেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।










