ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়ার নবীনগর ও ইপিজেড হয়ে সাভার শ্রীপুর পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ।

উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও চট্টগ্রাম বন্দরের বিরামহীন যোগাযোগের প্রত্যাশায় নির্মিত এই মেগা প্রকল্প এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে এর আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি নির্মিত বা নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের তুলনায় এই প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ হলেও সে তুলনায় নাগরিক বা অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ঢাকা আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে, যার মাধ্যমে এর ব্যয় আরও প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াচ্ছে ২৭,০৪৬ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক মেগা প্রজেক্টের ব্যয়ের তুলনা

সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের উপাত্ত এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সঙ্গে টাকার বর্তমান বিনিময় হারের ভিত্তিতে বিশ্বের ব্যয়বহুল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েগুলোর কিলোমিটারপ্রতি খরচের তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

এক্সপ্রেসওয়ে / প্রকল্পদেশবাস্তবায়নকালকিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় (কোটি টাকা)
ঢাকা আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়েবাংলাদেশ২০১৭–৩০১,১২৭
পোর্ট এক্সেস এলিভেটেড হাইওয়েশ্রীলঙ্কা২০১৯–২৬৮৩৭
দামনসারা-শাহ আলম (DASH)মালয়েশিয়া২০১৬–২২৬৩০
রামা ৩ এক্সপ্রেসওয়েথাইল্যান্ড২০২২–২৫৬১২
শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়েইন্দোনেশিয়া২০১৭–১৯৩ ৯০
ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়েচীন২০১৭–২৬৩৬৫
দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েভারত২০১৯–২৫৩২০

(তথ্যসূত্র: সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার)

আন্তর্জাতিক এক্সপ্রেসওয়েগুলোর বিশেষত্ব:

ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে (ভারত)

দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে (ভারত):

  • বিশেষত্ব: এটি ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ ৮-লেনের নিয়ন্ত্রিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং নজির: প্রকল্পটিতে ৩.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারতের দীর্ঘতম ও চওড়া অর্বান ইউটিলিটি টানেল এবং ৪-লেভেলের জটিল ইন্টারচেঞ্জ ব্যবস্থা রয়েছে। এর নিচের অ্যাট-গ্রেড অংশেও আলাদা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ফিচার রয়েছে।
ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
দামনসারা-শাহ আলম এক্সপ্রেসওয়ে – DASH (মালয়েশিয়া)

দামনসারা-শাহ আলম এক্সপ্রেসওয়ে – DASH (মালয়েশিয়া):

  • বিশেষত্ব: এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং স্মার্ট ফিচারের একটি আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে।
  • প্রযুক্তি ও সুবিধা: এতে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা (Solar Energy Generation), ১০০% নয়েজ ব্যারিয়ার (শব্দদূষণ কমানোর খাঁচা বা এনক্লোজার), ক্যাশলেস ফ্রি-ফ্লো টোল প্লাজা (MLFF) এবং ৯৫% সিসিটিভি কাভারেজ সংবলিত সেন্ট্রাল ট্রাফিক মনিটরিং সিস্টেম।

শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়ে (ইন্দোনেশিয়া):

ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়ে (ইন্দোনেশিয়া)
  • বিশেষত্ব: এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘতম ডাবল-ডেকার এলিভেটেড হাইওয়ে (৩৮ কিলোমিটার)।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল: বিদ্যমান ব্যস্ত হাইওয়ের ওপর দিয়ে সম্পূর্ণ ট্রাফিক চালু রেখেই প্রি-কাস্ট স্প্যান প্রযুক্তিতে অতি দ্রুত (মাত্র ২ বছরে) এটি নির্মাণ করা হয়, যা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের উদাহরণ।

ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে (চীন):

ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে (চীন)
  • বিশেষত্ব: এটি অতি দুর্গম পাহাড়ি, ভূমিকম্পপ্রবণ ও জাঁকজমকপূর্ণ নদী উপত্যকা এলাকায় নির্মিত।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং অলৌকিকতা: এই এক্সপ্রেসওয়েটির প্রায় ৯০% অংশই সেতু ও টানেলের (Tunnel) সমন্বয়ে গঠিত। এতে শত শত মিটার উঁচু পিয়ার (খুঁটি) এবং আধুনিক অ্যান্টি-সিসমিক (ভূমিকম্পসহনশীল) স্ট্রাকচারাল টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে।

রামা ৩ – ডাউ খানোং এক্সপ্রেসওয়ে (থাইল্যান্ড):

ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
রামা ৩ – ডাউ খানোং এক্সপ্রেসওয়ে (থাইল্যান্ড)
  • বিশেষত্ব: ব্যাংককের অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও ট্রাফিকপ্রবণ এলাকায় নদীর ওপর নির্মিত একটি ক্যাবল-স্টেড (Cable-stayed) ল্যান্ডমার্ক উড়ালসড়ক।
  • প্রযুক্তি: এতে রয়েছে উন্নত ট্রাফিক ডিসপ্লে বোর্ড, এয়ার কোয়ালিটি সেন্সর এবং ড্রেনেজের পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার বিশেষ মেকানিজম।

পোর্ট এক্সেস এলিভেটেড হাইওয়ে (শ্রীলঙ্কা):

ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
পোর্ট এক্সেস এলিভেটেড হাইওয়ে (শ্রীলঙ্কা)
  • বিশেষত্ব: কলম্বো বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালকে সরাসরি প্রধান হাইওয়ের সাথে যুক্ত করার জন্য তৈরি ডেডিকেটেড পোর্ট ফ্রিওয়ে।
  • প্রযুক্তি: সমুদ্র উপকূলীয় ও লোনা আবহাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য এতে অ্যান্টি-করোসিভ (ক্ষয়রোধী) বিশেষ কনক্রিট ও স্টিল স্ট্রাকচার ব্যবহার করা হয়েছে।

আরো জানুন- ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

ব্যয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তির তফাত:

“বিশ্বের অন্যান্য দেশের এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব সুবিধা। ভারতের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েতে রয়েছে ৩.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ ও ৪-লেভেলের ইন্টারচেঞ্জ ব্যবস্থা। মালয়েশিয়ার DASH এক্সপ্রেসওয়েতে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও ১০০% ‘নয়েজ ব্যারিয়ার’। ইন্দোনেশিয়ার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়েটি অত্যন্ত ব্যস্ত সড়কের ট্রাফিক চালু রেখেই মাত্র ২ বছরে নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনের ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়েটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ৯০% ব্রিজ ও টানেলের সমন্বয়ে তৈরি।

অথচ কোনো বিশেষ প্রযুক্তি বা সুড়ঙ্গপথ না থাকা সত্ত্বেও ঢাকা আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে এই খরচ ১,১২৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ৩.৫ গুণ বেশি।”

আন্তর্জাতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ:

উপরে উল্লেখিত পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় যে—

  • ভারতের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে: ২০১৯–২৫ মেয়াদে নির্মিত ভারতের প্রথম ৮ লেনের আধুনিক উড়ালসড়ক ও সুড়ঙ্গপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হচ্ছে মাত্র ৩২০ কোটি টাকা
  • চীনের ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে: দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও জটিল ভূ-প্রকৃতিতে ২০১৭–২৬ মেয়াদে নির্মিত এই উড়ালসড়কে খরচ হচ্ছে কিলোমিটারপ্রতি ৩৬৫ কোটি টাকা
  • মালয়েশিয়ার দামনসারা-শাহ আলম: সৌরবিদ্যুৎ, ড্রেনেজ ও সাউন্ড ব্যারিয়ার সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক্সপ্রেসওয়েটিতে খরচ হয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা
  • বাংলাদেশের ঢাকা-আশুলিয়া: কোনো বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক জটিলতা বা অতিরিক্ত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার না করা সত্ত্বেও ঢাকার এই ২৪ কিমি এক্সপ্রেসওয়েতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হচ্ছে ১,১২৭ কোটি টাকা—যা ভারতে নির্মিত এক্সপ্রেসওয়ের তুলনায় প্রায় ৩.৫ গুণ এবং চীন ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় ৩ গুণেরও বেশি।

মেগা বাজেটের অংক: কোথায় বাড়ল ব্যয়?

প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়কের হালনাগাদ উপাত্ত:

  • প্রাথমিক প্রাক্কলন (২০১৭): ১৬,৯০১ কোটি টাকা।
  • দ্বিতীয় সংশোধনী (২০২৬): ২৭,০৪৬ কোটি টাকা (ব্যয় বৃদ্ধি ৫৪% বা ৯,৪৯৩ কোটি টাকা)।
  • ভৌত অগ্রগতি: ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৩.৫ শতাংশ।
  • নতুন সময়সীমা: প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান ৩ কারণ:

১. টাকার অবমূল্যায়ন: ডলারের দর বৃদ্ধির কারণে বিনিময় হারেই অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ৩,৭৩৬ কোটি টাকা।

২. নকশা পরিবর্তন: তুরাগ নদীর শাখা অতিক্রম ও কারিগরি সংশোধনে লাগছে ১,৭৬৯ কোটি টাকা।

৩. অধিগ্রহণ ও স্থানান্তর: জমি অধিগ্রহণ, ট্যাক্স-ভ্যাট ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে যুক্ত হয়েছে ৩,৯৮৮ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: ‘পরিকল্পনার চরম ঘাটতি’

প্রকল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক জানান, বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভবিষ্যৎ চাহিদা ও পরিবেশিক রিটার্ন হিসাব করে নকশা করা হয়, যা আমাদের দেশে অনুপস্থিত।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, প্রকল্প শেষ পর্যায়ে এসে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হলে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (FIRR) ভেঙে পড়ে।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাথমিক নকশায় ঘাটতি ও মালামাল ক্রয়ে অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে।

কী থাকছে এই মেগা প্রকল্পে?

  • উড়ালপথ: ২৪ কিলোমিটার প্রধান এক্সপ্রেসওয়ে।
  • র‍্যাম্প: ওঠানামার জন্য ১১ কিলোমিটার র‍্যাম্প।
  • অন্যান্য: ২ লেনের নবীনগর ফ্লাইওভার, বাইপাইলে ইন্টারচেঞ্জ, ১৪ কিমি নিচের সড়ক পুনর্নির্মাণ ও ইউটিলিটি ডাক্ট।

নীতি নির্ধারকদের নীরবতা

মেগা প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে প্রায় ৯,৫০০ কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক বোঝা বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও স্পট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অর্থ ও পরিকল্পনা খাতের সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের নকশাগত ত্রুটি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার দাম বৃদ্ধি ও বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। একইসঙ্গে দেশের অর্থ যেন অপচয় না হয়, সে বিষয়ে কড়া নজরদারি চালু করার তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

সূত্র: বণিক বার্তা