জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬

আজ ‘জুলাই শহীদ দিবস’। শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। একই দিন চট্টগ্রামে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম।

বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে প্রথমবারের মতো একদিনে প্রাণ হারান ছয়জন। পরে দিনটিকে সরকার ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

দিবসটির সরকারি মর্যাদা ও ছুটির বিষয়

জুলাই শহীদ দিবস মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জাতীয় দিবস তালিকায় ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই শ্রেণির দিবসগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হলেও ‘ক’ শ্রেণির মতো ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, ফলে এদিন সাধারণ সরকারি ছুটি নেই।

আজকের কর্মসূচি

আজ দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।

জুলাই শহীদদের রুহের মাগফিরাতের জন্য সব মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভার আয়োজন করা হচ্ছে।

দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন কক্সবাজারের পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিমের বাড়িতে গিয়ে সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন এবং চট্টগ্রামের মুরাদপুরে তাঁর শাহাদাতস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।

উত্তরায় বুক পেতে দেয়া দুর্জয়কে গুলি

জুলাই-আগস্টজুড়ে মাসব্যাপী রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি

জুলাই শহীদ দিবস ছাড়াও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকার পুরো জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ১৫ জুলাই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার স্মৃতিতে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়েছে।

আগামী ১৮ জুলাই ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে’ উপলক্ষে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে প্রতিবাদী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, আর ২৪ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক প্রতিরোধের স্মরণে বিশেষ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে আন্দোলনের সময় অন্তত ৮০ জন শহীদ হয়েছিলেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

মূল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ পালনের মাধ্যমে, যেদিন রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই দিন ভোর ৬টায় শাহবাগে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সংবর্ধনা এবং প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে চলবে।

যেভাবে গতি পায় আন্দোলন

শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্দোলন দমাতে ছাত্রদের ওপর ব্যাপক গুলি চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদের মৃত্যু গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয় এবং আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সমর্থকদের হামলায় সেদিন আবু সাঈদ ও ওয়াসিমের পাশাপাশি সারা দেশে আরও চারজন শহীদ হন।

শহীদ অন্য চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন ঢাকার-নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। বাকি দুজন চট্টগ্রামের-এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। এ ছাড়া আহত হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা।

জেলায় জেলায় সংঘর্ষ ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসিনা সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করে।

তবে এই দমনপীড়ন আন্দোলন থামাতে পারেনি। কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনে-সরকারের পদত্যাগের দাবিতে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।