ভেজাল খাদ্য

খাদ্যে ভেজালের নৈরাজ্যে এখন সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সাধারণ মানুষ যে পণ্যগুলোকে নিরাপদ বা পুষ্টিকর মনে করে বেশি দামে কিনছেন, অসাধু সিন্ডিকেট চক্র ঠিক সেগুলোকে টার্গেট করে তৈরি করছে নকলের চোরাবালি। সম্প্রতি ওটস (Oats), চকবাজারের কসমেটিকস এবং আখের লাল চিনির ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের (যুগান্তর,চ্যানেল২৪,যমুনা টিভি) অনুসন্ধানে এর ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়েছে।

১. বিদেশি ব্র্যান্ডের মোড়কে ভেজাল শিশুখাদ্য: ওটসের আড়ালে বিষ

শিশুদের পুষ্টির কথা চিন্তা করে অনেক বাবা-মা সাধারণ বা দেশি খাবারের চেয়ে বিদেশি ও নামী ব্র্যান্ডের অর্গানিক খাবারের ওপর আস্থা রাখেন। আর এই আস্থার সুযোগ নিয়েই গড়ে উঠেছে নকল ওটসের এক বিশাল কালোবাজারি সিন্ডিকেট।

প্রতারণার কৌশল ও নেটওয়ার্ক

  • ব্র্যান্ড ও মোড়ক নকল: অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ব্রোকার ব্র্যান্ডের ‘অর্গানিক বেবি ওটস’ (যা মালয়েশিয়ার হেলথ প্যারাডাইজ কোম্পানির) এবং কানাডার ‘কাউহেড’ (Cowhead) ব্র্যান্ডের অর্গানিক ওটসের হুবহু নকল প্যাকেট তৈরি করা হচ্ছে। আসল আমদানিকারকের ভুয়া ঠিকানা এবং কোনো অনুমতি ছাড়াই প্যাকেটে বিএসটিআই (BSTI)-এর লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে।
  • উৎপাদন ও পাইকারি হাব: পুরান ঢাকার বেগমবাজার, মৌলভীবাজার ও চকবাজার হলো এই নকল ওটসের মূল পাইকারি সরবরাহ কেন্দ্র। অনুসন্ধান বলছে, মাত্র ৭০ হাজার টাকার একটি সাধারণ স্থানীয় মেশিন দিয়ে খোলা নিচুমানের ওটস এবং ধান চ্যাপ্টা করে এসব নকল প্যাকেট তৈরি করা হচ্ছে।
  • আর্থিক খতিয়ান: আসল ৫০০ গ্রাম ওটসের দাম প্রায় ৫০০ টাকা হলেও, এই নকল পণ্য বাজারে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায় মিলছে, যা পাইকারি বাজারে মাত্র ৭৫ থেকে ১২০ টাকায় কেনাবেচা হয়। ‘আরআর ট্রেডিং’ নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের এক মাসের ডিলারশিপ বাণিজ্যই প্রায় ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে কেবল একটি চক্রই প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার নকল ওটসের বাণিজ্য করছে।

ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR)-এর ল্যাব টেস্টে এই নকল ওটসে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের ভয়াবহ উপস্থিতি মিলেছে:

  • প্রতি গ্রামে ব্যাকটেরিয়া: ৬৩,০০০ টি
  • প্রতি গ্রামে ছত্রাক (Fungus): ৩৮,০০০ টি

বিশেষজ্ঞ মতামত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মতে, এই নকল পণ্যে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি ছত্রাক রয়েছে। এই ছত্রাক থেকে উৎপন্ন ‘অ্যাফলাটক্সিন’ (Aflatoxin) শিশুদের অপরিণত ইমিউন সিস্টেম ধ্বংস করে সরাসরি লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করছে।

আরো পড়ুন- ভেজাল খাদ্য কেলেঙ্কারি: নেসলে, মেঘনা ও এসএ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

২. চকবাজারের ‘চকের মাল’: কসমেটিকস ও অনলাইন ব্যবসার নকল চোরাবালি

দেশের পাইকারি বাণিজ্যের অন্যতম নাভি বলা হয় পুরান ঢাকার চকবাজারকে। প্রতিদিন এই এলাকায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার সিংহভাগই হয় নগদে। কিন্তু এই বিপুল অর্থনৈতিক প্রবাহের আড়ালে লুকিয়ে আছে নকল ও ভেজাল প্রসাধনীর বিশাল কালো সাম্রাজ্য।

ভেজাল খাদ্য
ছবি: সংগৃহীত

আস্থার সংকট ও নকলের বিস্তার

  • মেড ইন বাংলাদেশের বদলে ব্যঙ্গ: চকবাজারে বিদেশি নামী-দামী ব্র্যান্ডের কসমেটিকস ও মেকআপ সামগ্রীর হুবহু কপি বা ডুপ্লিকেট পণ্য খোলামেলাভাবে বিক্রি হচ্ছে। যার কারণে বাজারে পণ্যগুলোর গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম আস্থার সংকট।
  • অনলাইন ব্যবসার নেতিবাচক প্রভাব: সৎ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু অনলাইন ব্যবসায়ী এবং ই-কমার্স পেইজের মালিকরা বেশি লাভের আশায় চকবাজারের এই নকল চক্রগুলোকে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে কম দামে হুবহু বিদেশি ব্র্যান্ডের মতো কসমেটিকস বানিয়ে নিচ্ছে।
  • মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি: ল্যাব টেস্ট ছাড়া গোপন ফ্যাক্টরিতে তৈরি এই কসমেটিকসগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত ‘মার্কারি’ বা পারদ এবং সস্তা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো ব্যবহারের ফলে ক্রেতাদের ত্বক স্থায়ীভাবে ঝলসে যাওয়া, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদে স্কিন বা ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা তীব্র।

৩. আখের ‘লাল চিনি’র নামে টেক্সটাইল রঙের বিষ

পুষ্টিবিদদের পরামর্শে অনেকেই সাদা চিনির ক্ষতিকর দিক এড়াতে এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা থেকে আখের লাল চিনি বা ব্রাউন সুগার বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু ক্রেতাদের এই স্বাস্থ্য সচেতনতাই এখন অসাধু সিন্ডিকেটের জন্য অতিরিক্ত মুনাফা লোটার ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈশিষ্ট্যআসল লাল চিনিকেমিক্যালযুক্ত নকল লাল চিনি
মূল উপাদানআখের প্রাকৃতিক রস ও মোলাসেসসাদা চিনি + টেক্সটাইল রং + কেমিক্যাল
বাজার মূল্য (প্রতি কেজি)সরকারি রেট: ১৩০ – ১৩৫ টাকাভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি: ১৭০ – ২০০ টাকা
বিএসটিআই অনুমোদনবৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্তভুয়া বা জাল বিএসটিআই লোগো

তৈরি ও বিপণনের ভয়াবহতা

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েছে এই চিনির ভেজাল। অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ সাদা চিনির সাথে কাপড়ের কারখানায় ব্যবহৃত শিল্পজাত টেক্সটাইল রং এবং বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে গাঢ় বাদামী বা লালচে রঙে রূপান্তর করছে। এরপর ‘বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন’ বা স্বনামধন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেট হুবহু নকল করে বাজারে ছাড়ছে। সাধারণ সাদা চিনি যেখানে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি, সেখানে এই বিষাক্ত লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায়।

জনস্বাস্থ্যে এর প্রভাব

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারে কাপড়ের রং বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল মেশানো সরাসরি শরীরে বিষ প্রয়োগের শামিল। দীর্ঘদিন এই ভেজাল চিনি খাওয়ার ফলে মানুষের:

  • কিডনি ও লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে।
  • পাকস্থলীতে আলসার ও ক্যান্সার সৃষ্টি হচ্ছে।
  • শিশুরা সবচেয়ে বেশি হরমোনাল ও শারীরিক পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়ছে।

প্রতিকার ও আইনি সীমাবদ্ধতা

The Pure Food Act বা নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও, আইনের প্রয়োগ ও ঢিলেঢালা নজরদারির কারণে এই অপরাধ কমছে না।

করণীয়:

  1. কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান: শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিএসটিআই-এর সমন্বয়ে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার, চকবাজার ও ডেমরার মতো সোর্সিং হাবগুলোতে নিয়মিত চিরুনি অভিযান চালাতে হবে।
  2. ডিজিটাল ট্র্যাকিং: আসল আমদানিকৃত পণ্যের মোড়কে এমন বারকোড বা কিউআর কোড (QR Code) বাধ্যতামূলক করা উচিত, যা স্ক্যান করে ভোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিএসটিআই-এর ডাটাবেজ থেকে আসল আমদানিকারকের তথ্য যাচাই করতে পারেন।
  3. ভোক্তা সচেতনতা: অস্বাভাবিক কম দামে বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং চেইন শপ বা বিশ্বস্ত উৎস ছাড়া কসমেটিকস ও শিশুখাদ্য কেনায় সতর্ক হতে হবে।

উপসংহার:

খাদ্যে বা প্রসাধনীতে এই ভেজাল চক্রের কর্মকাণ্ড কেবল বাণিজ্যিক অপরাধ নয়—এটি পুরো একটি প্রজন্মের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ। অবিলম্বে যদি এই সিন্ডিকেটগুলোকে কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে আগামী দিনে দেশের চিকিৎসা খাত ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

সূত্র: যমুনা টিভি, চ্যানেল২৪, দৈনিক যুগান্তর