Home নাগরিক দুর্ভোগ জ্বালানির দাম বাড়লেও কাটেনি ভোগান্তি; তেলের লাইনে অন্তহীন অপেক্ষা ও হাহাকার

জ্বালানির দাম বাড়লেও কাটেনি ভোগান্তি; তেলের লাইনে অন্তহীন অপেক্ষা ও হাহাকার

16
0
জ্বালানি সংকট

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং সরবরাহ বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চালক ও কৃষকদের। এমনকি লাইনে দাঁড়িয়ে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় লাইনের আকার কোথাও কোথাও কমলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হতে অনেক দেরি।

রাজধানীর চিত্র: ৩ থেকে ৮ ঘণ্টার অপেক্ষা

রাজধানীর তেজগাঁও, মগবাজার ও প্রগতি সরণি এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, যেসব পাম্পে তেল রয়েছে সেখানে উপচে পড়া ভিড়। কোথাও ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা, আবার কোথাও ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশনে সন্ধ্যায়ও ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। চালকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর মিললেও চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে।

সাভারে ৬৫ শতাংশ পাম্পে নেই অকটেন

ঢাকার অদূরে সাভারের চিত্র আরও ভয়াবহ। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাভারের ৫২টি পাম্পের মধ্যে মাত্র ১৫টিতে অকটেন মজুত রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ পাম্পেই অকটেন বা পেট্রোল নেই। সাভারের লালন সিএনজি স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেল চালক ইকবাল হোসেন বলেন, “দাম বাড়ার পর সরবরাহ বাড়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অল্প তেল পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার।”

বিপাকে বোরো চাষিরা: ব্যাহত হচ্ছে সেচ কাজ

রাজধানীর বাইরে জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষিখাতে। বরিশালের আগৈলঝাড়া, রাজবাড়ী এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, ডিজেলের জন্য কৃষকদের মধ্যে হাহাকার চলছে।

  • আগৈলঝাড়া: রাজিহার গ্রামের কৃষক ইসলাম সরদার জানান, নির্ধারিত দামে সীমিত তেল দেওয়া হচ্ছে যা দিয়ে এক দিনের কাজও চলে না। এতে ধান মাড়াই ও সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
  • রাজবাড়ী: চন্দনী ইউনিয়নের কৃষক জয় কুমার বিশ্বাস বলেন, “তেল নিতে গিয়ে দিনের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফসল ক্ষতির মুখে পড়বে।”
  • টাঙ্গাইল: ঘাটাইলের তমা ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

অবৈধ মজুত ও প্রশাসনের অভিযান

সংকটকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করছেন। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে:

  • ২১ এপ্রিল: এক দিনে ৩০৩টি অভিযানে ৬৩ জনকে ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ৯ হাজার ২৪৪ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে।
  • ৩ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল: মোট ১১ হাজার ১৯৭টি অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯৩ লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। রংপুর ও শেরপুরে অবৈধ মজুতের দায়ে কয়েকজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

মালিক সমিতির বক্তব্য

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, “সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বাস্তব উন্নতি হয়নি। তেল কোম্পানিগুলো সব পাম্পে একযোগে সরবরাহ না করায় নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডিজেলের চাহিদা অনেক বেড়েছে, যা সেচ মৌসুমে সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কঠোর বাজার তদারকি না হলে এই জনভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সূত্র: সমকাল