Home আন্তর্জাতিক রাখাইনে আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে হামলা: বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করলো এএ

রাখাইনে আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে হামলা: বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করলো এএ

271
0
রাখাইনে আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বহুদিন ধরেই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে আরাকান আর্মি (এএ) সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো—আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)—বিভিন্ন সময়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।

এ নিয়ে মিয়ানমারের দৈনিক পত্রিকা দি ইরাবতী  গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিলো- AA Chief Accuses Bangladesh Officials of Inciting Rohingya Insurgent Attacks.

রাখাইনে আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে হামলা
স্ক্রিনশট- দি ইরাবতী

এই জটিল প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এএ প্রধান মেজর জেনারেল তুন মায়াত নাইং অভিযোগ তুলেছেন যে, বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের এএ ঘাঁটিতে হামলায় মদদ দিয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, তবুও এটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতিকে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।

হামলার ঘটনা ও অভিযোগ

১৮ সেপ্টেম্বর রাতে রাখাইনের মংডউ টাউনশিপে এএ-এর একটি ঘাঁটিতে আরসা ও আরএসও যোদ্ধারা একযোগে হামলা চালায়। এএ প্রধানের দাবি, এই হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনা ছিল। তিনি বলেন, আগে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে, কিন্তু এখন তাদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয়ের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে।

তুন মায়াত নাইং-এর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জঙ্গিদের তাউংপিও শহর অথবা তার উত্তরে এএ-এর অবস্থানে আক্রমণ চালাতে বলেছেন। এমনকি বিদ্রোহীদের হাতে যে অস্ত্রই থাকুক না কেন, তা দিয়েই হামলা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে দি ইরাবতী জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা

আরসা এবং আরএসও—দুটিই সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন সক্রিয়।

  • আরসা: ২০১৭ সালে হিন্দু গ্রামবাসী হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে খুনোখুনির অভিযোগে বিতর্কিত। মিয়ানমার ও মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরসা এএ-এর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পক্ষেও কাজ করছে।

  • আরএসও: ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আবার সশস্ত্র হয়। যদিও শুরুতে জান্তার সঙ্গে জোট বেঁধে এএ-এর বিরোধিতা করেছিল, পরে এদের বিরুদ্ধেও শিশু সৈনিক নিয়োগ ও অপহরণের অভিযোগ ওঠে।

এএ-এর দাবি, এসব গোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে রাখাইনে প্রবেশ করে স্থানীয় অ-মুসলিম জনগণকে হত্যা বা অপহরণ করছে। এরপর তারা নিহতদের গায়ে এএ-এর পোশাক পরিয়ে প্রচার করছে যে এএ-এর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। বাস্তবে ভুক্তভোগীরা ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক।

কৌশলগত অবস্থান ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ

বর্তমানে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে ২৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তও অন্তর্ভুক্ত। বুথিডং ও মংডউয়ের মতো সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এএ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা সীমান্তের দীর্ঘ অরক্ষিত অংশকে ব্যবহার করছে। ফলে সীমান্তে অনুপ্রবেশ, অপহরণ ও হত্যার মতো ঘটনাগুলো বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের জটিলতা

এই অভিযোগের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে জর্জরিত। ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে প্রচেষ্টা চালালেও মিয়ানমারের সামরিক সরকার এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

এ অবস্থায় মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপের দায় বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ওপর চাপানো কেবল দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসই বাড়াবে। ইতোমধ্যেই সীমান্তে গুলি বিনিময়, গোলা পড়া এবং অনুপ্রবেশের মতো ঘটনাগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব

১. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন:
বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এএ প্রধানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান না করে কিংবা এর জবাব না দেয়, তবে মিয়ানমারপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী এই অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। এতে সীমান্তে উত্তেজনা আরও বাড়বে।

  1. শরণার্থী সংকট আরও জটিল হতে পারে:
    রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা যদি সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় হয় এবং মিয়ানমার এ অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে, তবে নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল নামতে পারে। এতে বাংলাদেশের মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণে বাড়বে।

  2. আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি:
    বাংলাদেশ, মিয়ানমার, এমনকি ভারতের মিজোরাম ও মণিপুর রাজ্যও এই অস্থিতিশীলতার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সীমান্তে অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

  3. আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান:
    বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সমস্যায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছে। কিন্তু যদি এমন অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব পায় যে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিদ্রোহীদের মদদ দিচ্ছে, তবে বাংলাদেশের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

বিশ্লেষণ

এএ প্রধানের অভিযোগটি হয়তো কৌশলগত প্রচারণার অংশও হতে পারে। রাখাইনে এএ বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে আছে, এবং সামরিক জান্তার পাশাপাশি রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদেরও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপর অভিযোগ চাপানো হতে পারে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।

অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া না দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। একইসঙ্গে সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে।

রাখাইন রাজ্যের সংঘাত এখন শুধু মিয়ানমারের ভেতরের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশসহ সমগ্র অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এএ প্রধানের অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—

  • সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা,

  • আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা,

  • এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সমাধান খোঁজা।

কারণ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

— আন্তর্জাতিক ডেস্ক। সূত্রঃ দি ইরাবতী