Home বাংলাদেশ সাদা পাথর লুট: দায় কার, জবাবদিহি কোথায়?

সাদা পাথর লুট: দায় কার, জবাবদিহি কোথায়?

279
0
সাদা পাথর লুট

স্বচ্ছ জলের নিচে জেগে থাকা ছোট-বড় সাদা পাথর যেন প্রকৃতির নিঃশব্দ ধনভাণ্ডার। অথচ দিনের আলোয়, সকলের চোখের সামনে, এই ধনভাণ্ডার লুট হচ্ছে—প্রশাসন জানে, রাজনীতি জানে, এমনকি জনগণও জানে। তবু থামছে না। কেন?

ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে ধলাই নদীর উৎসমুখ—যা আজ ‘সাদা পাথর’ পর্যটনকেন্দ্র নামে খ্যাত। এর পাশেই ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি। পাহাড়ঘেঁষা এই নদী থেকে শ্রমিকরা পাথর তোলে, আর সেই শ্রমের নেপথ্যে থাকে রাজনীতির ছায়া। কারণ, উত্তোলনের মূল চালিকা শক্তি সেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও নেতা-নেত্রী—যারা আইনকে কাগজে রেখে নদীকে করে তোলে নিজেদের ব্যক্তিগত খনি।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লুটের সাম্রাজ্য

সিলেটের নদীপাড় একসময় ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের দশক থেকে পাথর উত্তোলন হয়ে ওঠে এক ধরনের অঘোষিত শিল্প। সরকার ইজারা দিলেও, নীতিমালা না মানা, যন্ত্রের বেপরোয়া ব্যবহার আর অব্যাহত পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে বহু কোয়ারি বন্ধ হয়। কিন্তু ‘বন্ধ’ মানে কার্যত ‘পর্দা ফাঁকা’—পেছনের মঞ্চে লুট চলতেই থাকে।

দলীয় রাজনীতির আশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালীরা প্রকাশ্যে পাথর তোলে, দাবি আদায়ে জনসমাবেশ ঘটায়, আর প্রশাসন চোখ ফিরিয়ে নেয়। উদাহরণ? গত বছরের ৫ আগস্ট—কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ থেকে কয়েক কোটি টাকার পাথর দিনের আলোয় তুলে নেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা নয়, দুই সপ্তাহ ধরে চলে এই লুট। মামলা হয়, আসামি তালিকায় রাজনৈতিক নেতাদের নাম থাকে—কেউ বহিষ্কৃত হন, কেউ থাকেন ছায়ার আড়ালে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

খনি ও খনিজ সম্পদ আইন-১৯৯২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় অনুমতি ছাড়া পাথর উত্তোলনে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনও একই সতর্কবার্তা দেয়। কিন্তু সমস্যা আইন নয়—সমস্যা প্রয়োগ। স্থানীয় প্রশাসন নিজেই স্বীকার করে, জনবল ও সরঞ্জাম নেই। বাস্তবে এই অক্ষমতা লুটেরাদের জন্য অলিখিত লাইসেন্সে পরিণত হয়।

পরিবেশ ধ্বংসের অদৃশ্য খরচ

পাথর উত্তোলন শুধু নদী থেকে পাথর সরাচ্ছে না—এটি নদীর গতিপথ বদলাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে, পানির প্রবাহ কমাচ্ছে, এবং পাহাড়ের ক্ষয় দ্রুততর করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই ক্ষতি মেরামত করা সম্ভব হবে না। অথচ রাষ্ট্রের চারটি মন্ত্রণালয়—খনিজ সম্পদ, পর্যটন, পরিবেশ ও স্বরাষ্ট্র—এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে। প্রশ্ন হচ্ছে, যখন সম্পদ রক্ষার চারটি দরজা থাকে, তখনও যদি চোর ঢোকে—তাহলে দায় কার?

সমাধানের শর্ত: রাজনৈতিক আশ্রয় কাটা

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাবেক নেতা আবদুল করিম কিমের কথায়, সাদা পাথর রক্ষার প্রথম শর্ত—লুটেরাদের রাজনৈতিক সমর্থন বন্ধ করা। দ্বিতীয় শর্ত—সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। প্রশাসনের একার পক্ষে এ লুট বন্ধ করা অসম্ভব, কারণ সমস্যা আইনের নয়, বরং ক্ষমতার।

আজ প্রশ্নটা স্রেফ পাথরের নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। যদি আমরা এই লুট বন্ধ না করতে পারি, তবে ইতিহাস একদিন লিখবে—আমরা সিলেটের সাদা পাথর বেচে দিয়েছিলাম ক্ষমতার খাতিরে, আর রেখে গিয়েছিলাম কেবল নদীর শূন্য বুকে ক্ষতচিহ্ন।