পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক ভ্রমণের একটি ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভ্রমনপ্রিয়র লেখা ইনিউজআপ এর পাঠকদের জন্য নীচে তুলে ধরা হলো–

“মাঝে মাঝে জীবন একঘেয়েমিতে ছেয়ে যায়, তখন হুট করে মন উড়ে যেতে চায় দূর ঠিকানায়। সেই উড়াল দেওয়াটা আমার জীবনের এক বড় স্মৃতি হয়ে যাবে তা কিছু সময় আগেও ভাবতে পারিনি। তবে এখনও মনে হয়, হয়ত আল্লাহ আমাকে অনেক পছন্দ করেন তাই আমার মনকে উড়িয়েছিলেন সেই সাজেকের দূর্গম প্রান্তরে কারও পাশে দাড়ানোর জন্য ।”

যা হোক হুট করে মনে হলো লম্বা শ্বাস নিতে হবে খোলা আকাশ…কোলাহল মুক্ত….।
বাচ্চা ২ জনকে তার বাবা ও আমার আম্মার কাছে রেখে বের হবার পরিকল্পনা।
যেই ভাবা সেই কাজ।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি ট্যুরের গেষ্ট হয়ে রওনা হলাম। ২ বাস রিজার্ভ।
তারপরেই সেই ভয়ানক ঘটনা!!

আমরা তখন সাজেকের ভেতরে প্রবেশ করেছি।আর মিনিট পাচেক গেলেই সাজেকের চূড়া।
লম্বা শ্বাস….আহ….!!

এমন সময় ৪/৫ টা মটর বাইকে ১০/১২ জন যুবক বয়স ২০/২২ এর বেশি হবে না। ভিষণ সাহসী যুবকগুলো।

৯ টা চাঁদের গাড়ি এক এক করে দাঁড় করালো। তখনও বুঝিনাই কি হতে চলেছে।

ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। একটি মেয়েকে টেনে হিচড়ে গাড়ি থেকে নামানো,ব্যাগ সিজ,মোবাইল নিয়ে তার পরিবার কে কল দেয়া…

ভাবছিলাম কি হতে পারে,তার প্রাক্তন প্রেমিক! নাকি অন্য মতলব?

একটু একটু করে বুঝে সামনে এগোতে শুরু করলাম…

আর বাকি ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক নিরব ভূমিকায় , তারা পিছু হঠতে লাগলো।

আতংক তৈরির জন্য মেয়েটাকে চড় থাপ্পড়,সবাই কে ভয়ভীতি দেখানো শুরু করলো…!

একটু পরেই বুঝে নিলাম ঘটনা কি হতে পারে…

মডেল- মাহবুবা রাখী ও প্রমূখ।

তাদের উদ্দেশ্য যে,
কোন এক মেয়েকে অপহরণ করবে।
তখন গভঃএর সাথে পার্বত্য চুক্তি নিয়ে ভীষন তোলপাড়।

সেই ইস্যুতেই এই অপহরণ…পরিকল্পনা!

৯ টি চাঁদের গাড়ি রির্জাভ ছিলো আমাদের। ছাত্র-ছাত্রী সব অনার্স পড়ুয়া। ৯ টি গাড়ি দাঁড় করিয়ে তার মাঝে এক ছাত্রীকে নামিয়ে নিলো। কি এক ভয়ংকর পরিবেশ!!

ডিপার্টমেন্টের হেড এর গেষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম এতো গুলো ছেলে-মেয়ে নিয়ে ট্যুর দিবেন, প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে নিবেন। কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বলেছিলেন…

দেশের বাহিরে যাই, সেদিনও সেন্টমার্টিন থেকে ঘুরে এলাম,এতো ভয় পেলে চলে…?
বললাম – এখন গ্যাঞ্জাম চলছে ওই দিকে, এই সময় যাওয়া কি ঠিক হবে?
যাইহোক আমিতো লম্বা শ্বাস নিতে যাচ্ছি…..আহ!

হেডকে ডেকে নিয়ে বললাম এভাবে একজন ছাত্রীকে নিয়ে যাবে আপনারা চেয়ে চেয়ে দেখবেন? সবাই তখন ভীত!

আরোও ৬ জন শিক্ষক,শিক্ষিকা ছিলেন সেখানে। সবাই কেমন চুপচাপ,কেও এগিয়ে যায় না।

এর মাঝেই শন্তু লার্মার মতো দেখতে একজন ভদ্রলোক জিপ গাড়ি নিয়ে সাজেকের দিকে যাচ্ছিলেন। হুক্কাতে বেশ ভাব নিয়ে টান দিচ্ছিলেন।

নেতা নেতা ভাব।
আমি গিয়ে হাত নাড়িয়ে গাড়িটা দাড় করালাম।
ভদ্রলোক নেমে জানতে চাইলেন সমস্যা কী?
আমি সব বললাম।ভদ্রলোক তাদের ভাষায় ছেলেগুলোর সাথে কথা বললেন কিন্তু লাভ হোল না।
আমিও আংকেল কে ছাড়ার বান্দা না।

এর মাঝে এক শিক্ষক আমার পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি নেতা গোছের ভদ্রলোক কে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছেন____
আমাদের গল্প উপন্যাসে পাহাড়িদের দুঃখদূর্দশার গল্প লিখি।
আর আজ পাহাড়িদের কাছে আমরা জিম্মি!

যেই বলা সেই কাজ…এই কথা শুনে নেতা ভদ্রলোক রেগে গাড়িতে উঠে গেলেন।
আমিতো নাছোরবান্দা….
আংকেল এর হাত ধরে মিনতির সুরে বললাম…আমাদের এই বিপদে ফেলে যেতে পারেন না।আংকেল একটু সাহস দিলেন।

 

হেড কে বললাম, ওদের টিমের সাথে কথা বলেন?
কেন জানিনা তখন বিন্দু পরিমান ভয় আমার মাঝে কাজ করছিলো না।
কোন পুরুষ শিক্ষক এগিয়ে যেতে সাহস পেলেন না।

হেড কে বললাম -এটা আপনার দ্বায়িত্ব। আপনি কথা বলে ওদের ব্যস্ত রাখেন আমরা এর মাঝে পুলিশের কাছে থেকে আনা আর্মি অফিসারের নাম্বারে কল দেই।

হেড তাদের সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলো কিন্তু! লাভ হলো না। এর মাঝে কল দেয়া শেষ।
মেয়েটাকে যখন মোটর বাইকে ওঠাবে, আমি আর নিতে পারছিলাম না। নিজের কথা ভুলে গিয়ে, সেই মেয়েকে তাদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আমার পেছনে দাড় করালাম। শুরু হলো বাক-বিতন্ডা….। তাদের কাছে সব দেশীয় অস্ত্র….!

শুধু মনে আছে বলেছিলাম, আমায় মেরে যদি নিতে পারো,নইলে সম্ভব না। ওকে রেখে আমরা ফিরবো না। হঠাৎ বাঁধা পেয়ে ওড়া একটু ভ্যাবা চ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলো! হয়ত এতোটা ওরা আশা করেনি।

এরই মাঝে আর্মি আসার সিগন্যাল পেয়ে কোথায় জেনো সন্ত্রাসিরা নিমিষেই মিলিয়ে গেলো,,,, পাহাড়ি এলাকা ওদের নখ দর্পণে।

ওরা চলে যাবার পর ছাত্র ছাত্রীরা আর সাজেক যেতেই চায়নি । ঢাকা ব্যাক করবে তখনি।

আমি বেকে বসলাম….এতদূর এসে ফিরে যাবে কেনো? ওরা ছিলো মাত্র ১০ জন, আর তোমরা?
তখন কেউ এগিয়ে এলে না? এখন কেনো রাগ দেখাও? পরে সবাই চুপ।

এর মাঝেই রিপোর্টার… হেডকে বললাম এই নিউজ জেনো কোনভাবে টিভি চ্যনেলে না যায়। ভিডিও তো দূরকি বাত….। পরে নিউজ চ্যানেলে গেছে ভিডিও ছাড়া অবশ্য।

মডেল- মাহবুবা রাখীএকেতো আমি না বলে বের হয়েছি….লম্বা শ্বাস নিতে……পারমিশান ছাড়া।
তারপর যদি নিউজে দেখায়! আরেক ভয়ানক কান্ড হবে।
সাজেকে ছবি তোলা হয়নি। সবাই আতংকিত ছিলো!

ঢাকা আসার পূর্ব পর্যন্ত সেই মেয়েটি আমার পাশেই ছিলো। তার ভীত মুখখানি এখনো চোখে ভাসে….।
বিপদে কারো পাশে না দাড়ানো মানে নিজের পরাজয় মেনে নেয়া।

সেদিন মনে হয়েছিলো এভারেস্ট জয় করে ফিরছি।
দু’দিন ছিলাম সাথে আর্মির ফোর্স ছিলেন।

আলুটিলা,রিসাং ঝর্ণা সব ঘুরে রওনা হলাম নিজ নিজ গন্তব্যে সেই ইট পাথরের শহরে।।
সাথে নিয়ে এলাম ভয়ংকর স্মৃতিময় সাজেক।

নিরাপত্তার স্বার্থে লেখক ও সংশ্লিষ্টদের নাম গোপন রাখা হয়েছে।

প্রতিকী মডেল- মাহবুবা রাখী