প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অর্জনের আশা বাংলাদেশের। চলমান কোভিড মহামারি, ইউক্রেন সংকট এবং বিশ্বমন্দার কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ সফর পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কৌশল ও কার্যক্রম গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আজ রোববার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমনটা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। সংবাদ সম্মেলন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনসহ মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় তিন বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফর প্রতিবেশী বন্ধুদেশটির সঙ্গে ঐতিহাসিক সুসম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে আশা প্রকাশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামীকাল সোমবার সকালে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরকালে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অমীমাংসিত ইস্যুসহ সম্পর্কের সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হবে। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর পানি ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, রেলওয়ে, আইন, তথ্য ও সম্প্রচারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্পর্কিত অন্তত সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ড. মোমেন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সুসম্পর্ক বর্তমানে বিশেষ উচ্চতায় অবস্থান করছে। বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে স্থল সীমানা ও সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ সারাবিশ্বের সামনে সহযোগিতার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় যেমন- নিরাপত্তা ইস্যু, আন্তঃসংযোগ, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জনযোগাযোগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক, আন্তঃদেশীয় বাস চলাচল, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আরও দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যুও সমাধান হয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে।
দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে বরাবরের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। একান্ত আলোচনায় কোনো এজেন্ডা থাকে না। ফলে সেখানে তারা যেকোনো বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন। বাংলাদেশ ও ভারতে সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে একান্ত আলোচনায় গণতন্ত্র, নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মতো বিষয়ে নেতারা কোনো আলোচনা করেন কিনা সে বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল রয়েছে। কেননা নির্বাচনের আগে দুদেশের শীর্ষ নেতাদের আর কোনো দ্বিপক্ষীয় সফরের সুযোগ কম।
দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠেয় একান্ত বৈঠক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি আছে। আর দিল্লিতে শীর্ষ পর্যায়ের একান্ত আলোচনার বিষয়বস্তু তার জানা নেই। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সরকার বিদেশে কোনো আলোচনা করে না।
রাশিয়ার তেল ভারতের মাধ্যমে আমদানির বিষয় নিয়ে সফরকালে কোনো আলোচনা হবে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ভারতের মাধ্যমে তেল কেনার পরিকল্পনা নেই সরকারের। তবে এ সফরে রাশিয়ার তেল নয়; ভারতের জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী এর আগে ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারত সফর করেন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভার্চুয়াল সামিটে অংশ নেন তিনি। ২০২১ সালে ভারতের সে সময়কার রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুজিববর্ষের আয়োজনে যোগ দিতে বাংলাদেশ সফর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি: সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করবেন। ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লি পৌঁছলেই সাক্ষাৎ করবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। বিকেলে শেখ হাসিনা দিল্লির হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ পরিদর্শন করবেন। রাতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন।
৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তিনি রাজঘাট গান্ধী সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা অর্পণ করবেন। এরপর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হায়দরাবাদ হাউসে অনুষ্ঠিত হবে দুদেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, জনযোগাযোগ, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সুরক্ষা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, মাদক চোরাচালান ও মানবপাচার রোধসহ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বৈঠক শেষে অন্তত ৭টি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর দুদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ বিবৃতি ঘোষণা করবেন। এছাড়াও ওইদিন প্রধানমন্ত্রী ভারতের রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি বিজনেস অনুষ্ঠানে যোগ দিবেন প্রধানমন্ত্রী। এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের চিত্র ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এবারের সফরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সেনাসদস্য শহীদ হয়েছেন বা আহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্টুডেন্ট স্কলারশিপ’ দিবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতীয় সেনাসদস্যদের মহান আত্মত্যাগকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জয়পুরের আজমির শরিফে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) মাজার জিয়ারত করবেন। সেখান থেকেই তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী: ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন সস্ত্রীক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। ৫৯ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলসহ এবারের দিল্লি সফরে মোট ১৫৭ জন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন।
সূত্রঃ কালবেলা







