Home নাগরিক দুর্ভোগ স্কুলের কাছে সিগারেটের দোকান, প্রশাসন নীরব কেন?

স্কুলের কাছে সিগারেটের দোকান, প্রশাসন নীরব কেন?

বিষাক্ত ধোঁয়ায় শৈশব বিপন্ন

402
0
স্কুলের কাছে সিগারেটের দোকান

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে তারা জ্ঞান অর্জন করে এবং সুস্থ জীবন গঠনে প্রস্তুত হয়। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে, এমনকি প্রবেশপথের লাগোয়া স্থানেও সহজলভ্যভাবে বিক্রি হচ্ছে সিগারেটসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য।

এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, আমাদের শিশু-কিশোরদের জন্য এক চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথ খুলে দিচ্ছে।’ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’-এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পাবলিক প্লেসকে ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

এমনকি আইন সংশোধনের খসড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যেই তামাকজাত পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৯০ শতাংশেরও বেশি। এসব দোকানে চকলেট, ক্যান্ডি ও খেলার সামগ্রীর পাশেই এমনভাবে সিগারেট রাখা হয়, যাতে শিশুরা সহজেই সেদিকে আকৃষ্ট হয়। এর ফলস্বরূপ, অল্প বয়সেই তামাক সেবনের প্রতি ঝুঁকছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সিগারেট ও ধূমপায়ীদের দেখলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাকসেবী হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া, সহজলভ্যতার কারণে তারা শখের বশে শুরু করে এবং পরে তা মরণ নেশায় পরিণত হয়। ধূমপান যে কেবল ফুসফুসের ক্যান্সার বা হৃদরোগের মতো মারাত্মক রোগের কারণ, তা নয়; এটি মাদক গ্রহণের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

আমরা মনে করি, বর্তমান আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক বিক্রি বন্ধে যে বিধান আছে, তার কঠোর ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। একইসঙ্গে, তামাক কোম্পানিগুলো যেন নতুন নতুন কৌশলে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা চালাতে না পারে, সেদিকেও কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি:

১. আইনের কঠোর বাস্তবায়ন: বিদ্যমান ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’-এর ধারাগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী স্থানকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত ও তামাকজাত পণ্য বিক্রয়মুক্ত ঘোষণা করে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

২. সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাকের ক্ষতিকর দিক এবং আইন সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

৩. কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা: স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং আইন বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

৪. বিক্রেতাদের নজরদারি: যে সকল দোকানদার ১৮ বছরের কম বয়সী কারও কাছে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইনি প্রতিকার ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ

এই ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু করণীয় রয়েছে। আইনের লঙ্ঘন দেখলেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা আবশ্যক।

যেসব জায়গায় অভিযোগ করা যেতে পারে এবং আইনি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে:

  • স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে তামাক বিক্রি বা প্রকাশ্যে ধূমপান সংক্রান্ত অভিযোগ স্থানীয় থানা বা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) / জেলা প্রশাসকের (DC) কার্যালয়ে জানানো যেতে পারে।
  • সিটি কর্পোরেশন / পৌরসভা: যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব দোকানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল বা তামাকমুক্ত এলাকা নিশ্চিত করার এখতিয়ার তাদের থাকে, তাই সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে।
  • জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (NTCC): স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই সেলে সরাসরি অভিযোগ জানানো যেতে পারে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে কাজ করে।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান: প্রথমে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করা যেতে পারে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে বাধ্য থাকবে।
  • আইনজীবী বা বেসরকারি সংস্থা (NGO): প্রয়োজনে জনস্বার্থে মামলা (Public Interest Litigation – PIL) দায়েরের জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনি সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

শিশু-কিশোরদের সুস্বাস্থ্য এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকেরা একসঙ্গে এগিয়ে এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ থেকে তামাকের বিষাক্ত ছোবলকে চিরতরে দূর করা সম্ভব। কালক্ষেপণ না করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর আহ্বান জানাচ্ছি।

— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক, ইনিউজআপ ডট কম