যুক্তবর্ণে আটকানো বন্ধুত্ব শব্দটা বলা যত সহজ, রক্ষা করা ততটাই কঠিন মনে হয় আমার কাছে।
খুব ছোট বেলায় পাড়ার পাঁচ বাড়িতে খেটে খাওয়া মহিলার আমার সমবয়সী মেয়েটির সাথে যখন একই উঠানে খেলা করেছি,চোখ বন্ধ কপালে ফুলের টোকার ছোঁয়া পেয়েছি, তখন তাকেই বন্ধু ভেবেছি।
ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম সে আমার বন্ধু নয়, খেলার সাথী। না না ওর মা এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে বলে তা নয়,আমার আনন্দ উচ্ছ্বাসের গল্প গুলো ওর কাছে বলতে পারতাম না কিংবা সে বুঝতো না,শুধু মাত্র দৌড়ে দৌড়ে কয়েক গাছের পাতা একজায়গায় জড়ো করার পারদর্শীতা ছিল খেলার সময়।
এখনো যখন ওর সাথে দেখা হয়,খুবই আন্তরিকতার সাথে ওর কুশলাদি জিজ্ঞেস করি,ভাব বিনিময় করি,ভাবি জীবনের কোনো এক অংশে এই মানুষটি জড়িয়ে আছে।
বাল্যবন্ধুদের সাথে এখনো যখন কথা বলি,ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব কম,অতীত নিয়েই বেশি বলি।বাল্যবন্ধুত্বের রেশটা এখনো ধরে রাখতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।
যাদের সাথে আমি হেসেছি,কেঁদেছি,জীবনের কতগুলো সময় পার করেছি, ওরা আমার জীবনের অনেকটা অংশ এখনো জুড়ে আছে।
কিন্তু এদের মধ্যেই কি সবাই আমার নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিল,অবশ্যই না।
সবাই যে নির্ভরযোগ্য হবে না,সেটা এখন বুঝলেও তখন তো বুঝতাম না।
তারপরও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে একটা কথা আছে! সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে নির্ভার করার জন্য ঠিকই কাউকে খুঁজে নিয়েছি এবং এখনো আছে,যার সাথে অনায়াসে অবলীলায় নিজের কথা গুলো বলতে পারি,
এখানে সমযোগ্যতার প্রয়োজন হয়নি,হয়েছে শুধু বিশ্বাস যোগ্যতা।
যে আমার কথাগুলো তার ঝুলিতে অতি আদরে লালিত করবে।
গতরাতে ও এমন একজন বন্ধুর সাথে কথা হলো, কিছুদিন আগে ওর বাবা মারা গেছে, না যেতে পারার অপরাধ বোধে বার বার ফোন দেওয়া।
কথা চালিয়ে যাওয়ার মাঝখানে একটা সময় ও আমাকে বলল…
আমি জানি তুই যেখানেই থাক,তুই আমার অনেক নিরাপদ ও কাছের একজন, তুই না আসতে পারাতে দুঃখ নিস না।
একটা সময় অনুভব করলাম, ওর কথা শুনে আমি কাঁদছি।
এটাকে আমি কি বলবো!
ও হ্যাঁ, তার মানে এ-ই না অন্য যাদের সাথে চলতাম, তারা আমার বন্ধু না।
কথা কম বলা আমি কখনো বন্ধু আড্ডার মধ্য মনি হতে পারতাম না,তবে কিভাবে যেন অনেকের বন্ধক রাখা গচ্ছিত কথার সিন্দুক হতাম এবং সেটাকে রক্ষা করার লড়াইটা ও খুব তীব্র ভাবে আয়ত্ত করেছিলাম।এটা শুধু বন্ধু নয় আত্মীয়ের ক্ষেত্রে ও মেনে চলার চেষ্টা করেছি,এখনো করি।
কারণ নির্ভরতা কে আমার বন্ধুত্ব নামক স্থানটির ছাদ মনে হয়।
সহপাঠী ছিল অনেক জন,বড়জোর কয়েক জনের নাম বলতে পারবো, কিন্তু স্কুল বন্ধু!
ওদের সাথে বছরের পর পর বছর দেখা না হলেও আস্থার জায়গায় চুল পরিমাণ নড়চড় হয়নি।
দু একবার বলতে শুনেছি আমি স্রোতের বিপরীতে হাঁটা মানুষ, তাৎক্ষণিক ভাবে কষ্ট পেলেও এখন পাই না।
নদীর পাড়ের মেয়ে আমি স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে কতটা দম লাগে, শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লাগে তা আমি জানি।
যেখানে নাইন টেইনে পড়া অবস্থায় বিয়ে করে একটা মেয়ে ঘরকন্নার কাজে নৈপুণ্যতা অর্জনে ব্যস্ত,সে সময় আমি লোডশেডিং হওয়া সত্ত্বেও হ্যারিকেন-এর সলতের আলোতে গল্পের বইয়ের পাতায় মুখ থুবড়ে পরে ছিলাম, কখনো বায়োলজি খাতার চিত্রে নৈপুণ্য আনার জন্য কাটা কম্পাস হাতে, কিংবা খালি ঘরে নজরুলের কবিতা আওড়াতে ব্যস্ত।
এর জন্য কারো সাথে আমার তেমন দূরত্ব বাড়াতে হয়নি, শুধু মাত্র আলাদা করে একটু নিজেকে সময় দেওয়া, আর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়াতে হয়েছে।
এখনো গায়ে ভারী গহনা ভর্তি, অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েটির সাথে আমার ভালো সম্পর্ক আছে,এক সময় যাদের মুখেই শুনতে হতো, কিরে বয়স তো কম হলো না,তুই বিয়ে করছিস না কেন?
তো কি হইছে,আমার গায়ে ফোসকা পরছে?
আমার অনেক কাছের একজন মানুষকে আমি দেখেছি, কারো সাথে কোনো ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটি অথবা কোনো সমস্যা হলে তারে আর কখনোই মেনে নিতে পারতো না,চরম ভাবে পীড়া দিত এই ব্যাপারটা আমাকে।
যেহেতু মানুষটিকে আমি কখনোই শুধরাতে পারি নি, আমি নিজে শুধরেছি।
চরমভাবে অপছন্দ করতাম ব্যাপারটাকে।
মনে হতো ঝগড়ার সময়, হয়েছে নয়তো কিছু সমস্যা, পরে মিটমাট করে নিলে সমস্যা কোথায়!
একটা মানুষের সাথে দীর্ঘ দিন কথা না বলে থাকাটা আমার জন্য অনেক কষ্ট দায়ক ছিল।
তাই নিজেকে সেই ছোট বেলা থেকেই পরিচর্যা করেছি,যেন এই বিষয়টি আমার মধ্যে রোপিত না হয়,আমার মনে হয়েছে জীবনে চলার পথে এই বিষয়টি একটা আগাছা স্বরুপ। যা সামনে এগুনোর পথে পায়ে বাঁধে।
সবাই বন্ধু কিংবা সুজন হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, দূর্জন ও জীবনের ই অংশ।
বন্ধুত্বের দৃঢ়তা একপেশে হলে সেখানে সুর তার লয়,আসলেই ঠিক থাকে না,শুধু শুনে গেলাম, বলতে পারলাম না।
শুধু অভিযুক্ত হলাম, অভিযোগ করলাম না,কেমন যেন ইদানিং মেনে নিতে কষ্ট হয়।
কে কি ভাবলো আমি জানি না,শুধু জানি বন্ধুত্বের স্থান কখনো দাম দর দিয়ে কেনা যায় না,অর্জন করতে হয়,কথায় কথায় বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গেল কিংবা করে দিলাম এটাও একধরনের হুমকি স্বরুপ, আত্ম অহংকার বলে মনে হয়।
দু জনের আলোচনা বিপরীত মুখী হয়ে গেলেই বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায় এটাও আমি ভাবতে পারি না কিংবা দৃষ্টি ভঙ্গি সবক্ষেত্রে একই হতে হবে তা ও নয়। সবকথায় সমর্থক হতে হবে! প্রত্যেকের সত্ত্বা আলাদা, মানসিকতা সর্বক্ষেত্রে এক হবে এমন ও ভাবতে পারি না।
বন্ধুত্ব আমার কাছে বিশাল এক আকাশ! যেখানে গর্জন হবে,বর্ষণ হবে, নির্মলতা থাকবে,থাকবে উদারতা, নক্ষত্র চাঁদের জোছনা ছড়াবে, অমানিশার প্রহর পরে সূর্যের আলো ফূটবে।
কিছু কিছু সৌন্দর্য এতই শক্তিশালী যে আনন্দে চোখে পানি এসে যায়,এমন নান্দনিক সৌন্দর্যময় বন্ধুত্ব আমার ও আছে যার বা যাদের জন্য আমার চোখে পানি এসে যায়। আলহামদুলিল্লাহ।
লেখক~জেসমীন আক্তার








