Home গদ্য-পদ্য “জীবনের উচাটন”

“জীবনের উচাটন”

112
0
জীবনের উচাটন

গনগনে সূর্যের তেজটা যখন ম্রিয়মান হয়ে নেতিয়ে দিগন্তের শেষ সীমারেখার সাথে আলিঙ্গনের পায়তারা করে,
তখন পাড়ার সব কিশোর কিশোরীরা কত কত নামের খেলা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতাম পাশের বাড়ির উঠোনে।
হৈ হুল্লোড়, উচ্ছ্বাস, উচ্ছ্বলতায় ও চোখ এড়াতো না বিমর্ষ, মলিন মুখটা।
কখনো কাগজের ঠোঙায় নিমকি কিংবা ঝালমুড়ি এগিয়ে, কখনো বা চুপিসারে মায়ের কাছে গিয়ে বলতাম , “মা আজকে অমুকের বাড়িতে রান্না হয়নি।”

স্কুল বেঞ্চিতে জোড়া সিংগাড়ার পরিবর্তে একটি কিংবা অর্ধেক ও খেয়ে থেকেছি।
কখনো পাশের জন টিফিন আনেনি, কখনো বা নিজে ও নেইনি।
ড্রাকুলার গল্প বলতে গিয়ে, ওর সামনের দুটো দাঁত আর হাতের তালুতে গজানো চুলের বর্ননা দিতে গিয়ে এমন ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করতাম যে,মামার বাসায় বোনদের সাথে কাটানো রাত গুলোতে এক কাঁথার নিচে জড়াজড়ি করে নির্ঘুম রাতকে করতাম ভোর।

দুই বান্ধবী মিলে শেয়ারে ভাড়া মিটিয়ে কলেজে আসলে ও কতসময় কারো একজনের টাকায় স্বল্পতা থাকলে সোয়ারী ঘাট থেকে আজিমপুর অবধি হেঁটে এসে মনে করতাম বিশ্ব জয় করেছি।
বাড়িতে কোনো মেহমান আসলে তাঁদের যেতে না দেওয়ার জন্য বোরকা কিংবা জুতো লুকোনের মধ্যে কি যে আনন্দ খুঁজে পেতাম!

মেহমান কার সাথে ঘুমাবে এ নিয়ে ও থাকতো আবদার।
জীবনের অনেকটা সময় পার করলাম, ঝুলিতে তেমন কিছুই নেই স্মৃতি গুলো ছাড়া।
উঠোনে যে বিমর্য মুখটি দেখেছিলাম, এখনো হৃদয়ে লেপ্টে আছে ভালোবাসা হয়ে।
এক অর্ধেক সিংগাড়া খেয়ে বেঞ্চ,সময় ভাগ করে নিয়ে যাদের সাথে কাটিয়েছি, তাদের সাথে আমি এখনো প্রাণ খুলে হাসতে পারি,অকপটে উগলে দিতে পারি মনের যত কথা।

একে অপরকে ছুঁয়ে, গল্পের ঝুলি মেলে যাদের সাথে রাত কাটিয়েছি তারা এখন সাত সমুদ্র তের নদীর ওপাড়ে থাকে।
ছুঁয়ে দিতে পারি না কিন্তু একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের “হ্যালো” শব্দটিতে বুঝে যাই কে কেমন আছি।
এখনো ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে নিজেদের সুখ দুঃখের উষ্ণতা অনুভব করার চেষ্টা করি।
দুই বান্ধবীর ফোনালাপে সাংসারিক মন খারাপের কথাকে মাড়িয়ে, হেসে লুটোপুটি হই হেঁটে কলেজে আসা, কিংবা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে নৌকা পাড় হওয়ার ঘটনা বলে।

আমাদের পারিবারিক কথার মাঝে এখন ও স্থান পায় বাড়িতে নানী আসলে কিভাবে রাত জেগে বসে বসে মামা বাড়ির গল্প শুনতাম।এবং যাওয়ার সময় তাঁর রুমালের গিঁট খুলে দুমড়ানো মোচড়ানো পাঁচ টাকার নোট দিতেন যেন মন খারাপ না করি ( অনেক ছোট বেলার কথা)।এর মধ্যে যে কি ভালোবাসা ছিল, আমি পৃথিবীর কোন প্রান্তে গেলে পাবো?
দিন,বছর, যুগ পাল্টেছে।

এখনকার কিশোর কিশোরীরা সেকেন্ডে সব কিছু শেয়ার করে নিতে পারে।
ওরা মুহূর্তের মধ্যে কথা,ছবি, ভিডিও শেয়ার করে নিয়ে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরেছে।
ওরা এতটাই এক্সাইটেড হয় যে পাশে কে কি বলছে তা কানেই যায়না, যখন মনিটর স্ক্রিনে খেলার চাল দিতে ব্যস্ত থাকে।
বিনয় নয়,তাচ্ছিল্যের হাসি লেগে থাকে গুরুজনদের অদুরদর্শিতায়।

ওরা নিজ স্মৃতি শক্তির অপব্যবহার না করে কিছু স্মরণীয় বিষয় বন্ধক রাখছে যান্ত্রিক মেমোরিতে।
ওরা সব জানে,চন্দ্রা দেশ, মঙলগ্রহ সহ সাগরের অতলে কত সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে,
হিমবাহ থেকে ঝরনা ধারার জল আছড়ে পরা পর্যন্ত এই বিরামহীন গতিধারা সম্পর্কে জানে।
এজন্য ওদেরকে ক্ষীণ আলোয় বইয়ের পাতার পর পাতা পড়তে হয়না।
একটু আঙুলের স্পর্শেই জয় করে ফেলে দিগবিদিক।

সাইক্লোন, ঘূর্নিঝড়ের শক্তির পূর্বাভাস জানে,জানে জীবনে হিসেবের সমীকরণ।
ওরা জানে না আমার খাট বা আমার ঘরের চেয়ে “আমাদের” শব্দটিতে কত মায়া জড়িয়ে আছে।
মাঝে মাঝে অন্যের জন্য নিজের প্লেট ও যে এগিয়ে দেওয়ার মধ্যে কতটা তৃপ্ততা, অজানাই রয়ে যায়।
সমবন্টন নয়,অসম বন্টনে কম অংশটা নিয়ে ও যে লাভবান হওয়া যায়, আদৌও কি ওরা বুঝবে?
ভাইয়ের কাঁধে বোনের কিংবা বোনের কাঁধে ভাইয়ের হাত যে কতটা শক্তির ধারক ওরা কি তা জানবে?
শত বন্ধুর মাঝে প্রকৃত বন্ধুকে খুঁজে নিতে পারবে তো?

হ্যাঁ, আধুনিকতার আলোয় চারদিক যেভাবে ভেসে যাচ্ছে,তাতে আমি নিজেই শঙ্কিত, আধুনিকতার পিষ্টতলে আন্তরিকতা চাপা পড়ে যাচ্ছে, তেমনই জাগতিক গুণাবলীর চাপায় মানবিক গুণাবলী।
কাছের সুক্ষ্ম অনুভূতি নয়,দূর দৃষ্টির প্রসারণ হচ্ছে। যন্ত্রের অপজিটে বসে তৈরি হচ্ছে যন্ত্রমানব।

লেখক- জেসমীন আক্তার