ক্রিংক্রিং….
হ্যালো!
কতগুলো বেহিসেবী গালি হজম করতে হলো নাস্তা না খাওয়া সকালে আমাকে।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ঊর্মি গালাগালি শেষ করে একটা পর্যায়ে আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিল আজকে যেন আমি ওদের সাথে বাইরে অর্থাৎ কানিজ বিথী এর বাড়ি শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু দূরে যাই।
বাড়িতে আমার সমস্ত কাজের কথা বিবেচনা করে যেতে না চাইলে ঊর্মির শ্রুতি মধুর কণ্ঠের ঝর্ণা ধারার শব্দ আবারও শুনতে হলো।
ফয়সালা এই হলো ঊর্মি আর কানিজ আগে যাবে, কাজ সেরে পরে আমি যাব।
আমি ও মিনিট, সেকেন্ড হিসেব করে কাজ করে যাচ্ছি আর একটু পর পর ঊর্মির অসাধারণ কথ্য ধারা গলিয়ে পরছে আমার কানে মোবাইল টু মোবাইলের মাধ্যমে।
কেমন টা লাগে!(ঊর্মি তুই এতবার ফোন দিয়ে আমারে গাইলায়ে কি মজা পাইছিলি?)
যা হোক দুপুর আড়াইটা নাগাদ আমি বের হলাম। কানিজের নির্দেশনা মোতাবেক যেখানে দাঁড়িয়ে ফোন দেওয়ার কথা তাই দিলাম, পূর্ণ উদ্যোমে আবার নতুন করে নির্দেশনা দিল আমাকে।
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে তার বাড়ি না কি দুই মিনিটের পথ,মসজিদের পাশে, চিপা গলিতে,একটাই নাকি সাদা রঙের বিল্ডিং, তার হাসবেন্ড এর নাম বলতে বলল।
দাঁড়িয়ে থাকা আমি লোকজনকে জিগ্যেস করলে তারা বললো “এখানে মসজিদ আছে তিনটা, আর যে নাম বললেন এই নামের মানুষ বহুত আছে, আপনে কার বাড়িত যাইবেন? ”
আমিও অসহায় দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম চিপা গলির অভাব নেই, হাজারে হাজারে সাদা রঙের বিল্ডিং বাড়ি।যারা কানিজের ফেসবুক বন্ধু, বুঝতেই পারছো ওর নির্দেশনা মানে ঘূর্ণিপাকে পরার মতো অবস্থা যেমনটা আমার হয়ে হয়েছিল, তাই সাবধান!
কতশত চিপা গলি ঘুরতে ঘুরতে চোখ আটকে গেল ইয়া বড় সাইজের টি শার্ট পরিহিত মেয়েটি আর কেউ নয় আমাদের ঊর্মিকে দেখে।
আমাকে নেওয়ার জন্য আসছে।(হঠাৎ দুই পাশেই ঘাসের ঝোপের মাঝে সরু রাস্তায় ঊর্মিকে দেখে মনে হয়েছিল সদ্য আমেরিকা থেকে আগত কোনো বিদেশিনী, যে আশেপাশের মানুষ কে থোড়াই কেয়ার করে।)
এতটাই বিরক্ত ছিলাম যে কিছু না বলেই হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে।দ্বিতল বাড়ির চিলেকোঠায় সুন্দর ছিমছাম, সাজানো গোছানো ঘরটা দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল।♥️
দ্বিতীয় বার চোখ আটকালো, লুঙ্গি পরিহিত উপজাতি বেশে কানিজ কে দেখে
(রাস্তায় আমাকে ভুল নির্দেশনা দেওয়ার জন্য চিন্তা করেছি দেখা হওয়া মাত্রই কিল, থাপ্পড়, ঘুসি দিয়ে মোলাকাত করবো। তা আর হলো কই ওর বেশভূষা দেখে আমি হাসতে হাসতে শেষ।)
পরে জানতে পারলাম ওরা দুই জনে যাওয়ার পথে রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গিয়ে ও ক্ষান্ত হয়নি,ছাদে গিয়ে ইচ্ছে মতো দাপিয়ে ভিজেছে যার ফলস্বরূপ কোনো জামা কাপড় না থাকায় কানিজ এর হাসবেন্ড এর লুঙ্গি, টি শার্ট পরে আছে একেকজন।
টি শার্ট এর সাইজ মাশয়াল্লাহ! (আহারে! বৃষ্টিটা আমি খুব মিস করেছিলাম।)
শুরু হয়ে গেল আমাদের হা হা, হি হি।কথায় কথায় হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরা।
রান্নার ফাঁকে কানিজ একটু পর পর কিসমিস মুখে দেয়,এটাতে নাকি ওর শরীরে কাজের এনার্জি বাড়ে।(শুধু বিরিয়ানি রান্না করতে ওর যে কত এনার্জি দরকার হয়ে ছিল।)
ওর স্বভাব টা আমার মধ্যে ও সংক্রমিত হলো। কিসমিস খেলে দেখি হাসতে হাসতে ব্যথা হয়ে যাওয়া গালের ব্যথা কমে,কি মজা!
আর ঊর্মি কোলে নিয়ে বসে থাকা বিস্কিটের ডিব্বা থেকে বিস্কুট খায় ক্ষুধা দূর করার জন্য কারণ অলস কানিজ বিকাল প্রায় সাড়ে চারটায় আমাদের খাবার পরিবেশন করে।
(অকর্মার মাসি)
শুধু তাই নয়, নিজের রান্নায় নিজে এতোটাই মুগ্ধ যে বার বার বলছে অনেক মজা হইছে।( কাচ্চিবিরিয়ানি ঘ্রাণে মাতোয়ারা পুরো ঘরময়।)
আমরা দুই জন কিছু না বলে শুধু খেয়েই যাচ্ছি।
পেটপুরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে দিলাম আমি আর ঊর্মি ঘুম, কিন্তু মোবাইল প্রেমী কানিজ না ঘুমিয়ে ওর ছবি, ভিডিও দেখে একা একাই মুগ্ধ হচ্ছিল।
চারদিকের মেঘাচ্ছন্ন, শ্যামল, সুন্দর পরিবেশের বিকেলের এই মায়া মুগ্ধকর সময়টা কে ঘুমিয়ে কাটাবো, এই হতেই পারে না ভেবে ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখা সিনেমার নায়িকার মতো লাফিয়ে উঠলাম।
ছায়া ঢাকা মেঘলা আকাশের নীচে আমরা দুই বন্ধু কিছুক্ষণ প্রকৃতি প্রেমে মত্ত হলাম (ঊর্মি তখনও ঘুমিয়ে)।
মাগরিবের আযান ছুঁই ছুঁই ঊর্মিকে ডেকে তুললাম, যে উঠেই বলে আমারে বিস্কুট দে।(বিস্কুট কোলে ঊর্মির একটা ছবি না তোলায় খুব আফসোস হচ্ছে।)
ফেইসবুক বন্ধুরা যারা ঊর্মির সাথে সংযুক্ত আছ,তারা বিস্কুট প্রেমী এই বন্ধুর বাসায় বিস্কুট নিয়ে গেলে খুব খুশি হবে,জানিয়ে রাখলাম।
বসত হীন এই বাড়িতে তালা খুলে ঢোকা এবং তালা লাগিয়ে বের হওয়া বাড়িতে পেটে জামিন দেওয়ার উপকরণ গুলো ছিল কিসমিস, চানাচুর, বিস্কুট, কাচ্চি বিরিয়ানি, লেবু,কোক স্প্রাইট আর চা।
চা পর্ব শেষ করে চিলেকোঠার ঘরটিতে তালা লাগিয়ে বের হওয়ার সময় টের পেলাম অধিক হাসির জন্য যে গালের চামড়া ব্যথায় টনটন করছে, ঊর্মির নাকি পেট ও ব্যথা হইছে আর কানিজের সারা শরীর তখন বিষে বিষে বিষময় হয়ে উঠছিল
ভিজে যাওয়া মাস্ক ফেলে দেওয়ায় মাস্ক হীন বের হতে হলো।
কী ভয়ংকর!
যায়গায় যায়গায় পুলিশের টহল!
গাড়ি আটক করছে, মাস্ক বিহীন মানুষকে ধরছে, কি একটা অস্বস্তিকর অবস্থা!
তিন বন্ধুই পড়িমরি করতে করতে পেয়ে গেলাম অটোরিকশা নসিমন (যার নাম আগে জানতাম না)।
অটোরিকশা চালক যার নাম দিলাম নসিমন ভাই,তার আমাদের উপর দয়া হলো,যে নির্দিষ্ট জায়গায় নামানোর কথা সেখানে না নামিয়ে আমাদের মিনতিতে আমাদের যার যার বাড়িতে নামিয়ে দিতে রাজি হলো।
আর আমরা পাংখা লাগিয়ে তিন বন্ধু প্রায় উড়তে উড়তে বাসায় চলে আসলাম
মাঝে মাঝে হাপিয়ে উঠা জীবন থেকে একটু নিরুদ্দেশ হতে ইচ্ছে করে কিংবা বৃদ্ধ অবস্থায় অবহেলিত জীবন থেকে পরিত্রাণ পাবো এই ভেবে চিলেকোঠার ঘরটিই হবে আমাদের সঠিক ঠিকানা এসব আলোচনা ও থাকলো অটোরিকশায় বসে।
এভাবেই আমাদের হুট করে আয়োজিত কানিজ এর বসিলা ব্রিজের ওপারে নির্মিত বাড়িতে ত্রিভুজ প্রেমের চিলেকোঠার গল্প শেষ হলো,শুধু রয়ে গেল আনন্দ অনুভূতির অসাধারণ রেশ…
লেখক- জেসমীন আক্তার










