বিএনপি চেয়ারপার্সনের একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার সরকারের আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে “সীমাহীন দুর্নীতির” প্রমাণ নিজের কাছে থাকার দাবি করার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এত সংখ্যক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একইসঙ্গে প্রথমবারের মতো অভিযোগ উঠল। অভিযোগের পরপরই সরকার তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে।

রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাত্তারের উত্থাপিত অভিযোগের পর ৯ আগস্ট শনিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব এক বিবৃতিতে তাকে আহ্বান জানান—যে প্রমাণ তার কাছে আছে, তা যেন তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন।

অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এই বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে সাত্তারের ব্যক্তিগত মত, দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে সাত্তার এখনো নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। ফলে প্রশ্ন রয়ে গেছে—সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কি পদক্ষেপ নেবে, নাকি সাত্তার নিজেই সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রমাণ দাখিল করবেন?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছেন, তাই দালিলিক প্রমাণ দেওয়াই তার দায়িত্ব। সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও সতর্ক করেন—অভিযোগকারী যদি প্রমাণ না দেন, ভবিষ্যতে এমন অভিযোগের গুরুত্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

শনিবার থেকেই সাত্তারের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে দুদকের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কে এই এ বি এম আব্দুস সাত্তার

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা সাত্তার খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব থাকা অবস্থায় তিনি অবসরপ্রাপ্ত হন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে ভূতপূর্ব সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এরপর অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। দায়িত্ব গ্রহণের পর ফেব্রুয়ারিতে তিনি ১০৬ জন কর্মকর্তার সদস্যপদ স্থগিত করেন, যার মধ্যে ৭০ জন সচিব ছিলেন। পরে মে মাসে আরও ছয়জনের সদস্যপদ স্থগিত হয়। পাশাপাশি তিনি বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতিও।

বিতর্কিত বক্তব্যের মঞ্চ

শুক্রবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে “জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন” শীর্ষক সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সাত্তার। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তিনি দাবি করেন—অন্তত আটজন উপদেষ্টার দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে রয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও এসব তথ্য আছে, তবুও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

এ সময় তিনি আরও অভিযোগ করেন,

এক উপদেষ্টার এপিএসের অ্যাকাউন্টে ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেলেও কোনো পদক্ষেপ হয়নি; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অনভিজ্ঞ উপদেষ্টাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে—যা তিনি প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন।

তার এই বক্তব্য সভায় হাততালি পায়, তবে নাম প্রকাশ না করেই অভিযোগ করার পর সরকার, বিএনপি এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সবাই নিজেদের দায় অস্বীকার করে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে সাত্তারের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে বলা হয়—প্রমাণ ছাড়া ঢালাও মন্তব্য জনআস্থার জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে তাকে অবিলম্বে প্রমাণ জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলও বলেন—দলের সঙ্গে এই মন্তব্যের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা সরকারের উপদেষ্টাদের সততা ও যোগ্যতার ওপর আস্থা রাখেন।

এরপর কী

অভিযোগের পর সাত্তার নীরব, ফোন বন্ধ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেহেতু অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, তাই সাত্তারের উচিত প্রমাণ সরবরাহ করা এবং দুদকেরও স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করা। অন্যথায় ভবিষ্যতে দুর্নীতি-বিরোধী প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

— নিউজ ডেস্ক