Home আন্তর্জাতিক কেন ‘ফাতাহ-২’ ঠেকানো প্রায় অসম্ভব? রণক্ষেত্রে ইরানের নতুন ‘গেম চেঞ্জার’

কেন ‘ফাতাহ-২’ ঠেকানো প্রায় অসম্ভব? রণক্ষেত্রে ইরানের নতুন ‘গেম চেঞ্জার’

21
0
ফাতাহ-২ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’, ‘ডেভিড স্লিঙ্গ’ কিংবা আমেরিকার ‘প্যাট্রিয়ট’ ব্যবস্থাগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে দক্ষ হলেও ইরানের নতুন সংযোজন ‘ফাতাহ-২’ (Fattah-2) হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে এগুলো প্রায় অকার্যকর। সামরিক ম্যাগাজিন মিলিটারি ওয়াচ-এর মতে, ফাতাহ-২ এখন পশ্চিমাদের জন্য এক অমীমাংসিত সমীকরণ।

১. অবিশ্বাস্য গতি: সময়ের সাথে লড়াই

ফাতাহ-২ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান শক্তি হলো এর গতি। এটি ম্যাক ১৫ (Mach 15) গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যেতে সক্ষম।

  • হিসাব: শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি দ্রুত অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮,৫২২ কিলোমিটার।
  • ফলাফল: ইরান থেকে ইসরায়েলের দূরত্ব প্রায় ১,০০০-১,২০০ কিমি। এই গতিতে ফাতাহ-২ মাত্র ৪ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। শত্রুপক্ষের রাডার এটি শনাক্ত করার পর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায় না।
ফাতাহ-২ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
ছবি: সংগৃহীত

২. হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV) প্রযুক্তি

সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একটি নির্দিষ্ট ধনুকাকৃতি পথে (Parabolic Path) চলে। কম্পিউটার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সেই পথ আগে থেকেই অনুমান করা যায় এবং ইন্টারসেপ্টর মিসাইল দিয়ে তা ধ্বংস করা যায়। কিন্তু ফাতাহ-২ ব্যতিক্রম।

  • এটি একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV)। এটি বায়ুমণ্ডলের ভেতরে প্রবেশের পর তার গতিপথ অনবরত পরিবর্তন করতে পারে।
  • এটি ডানে-বামে বা ওপরে-নিচে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে (Maneuverability)। ফলে কোনো কম্পিউটার বা রাডার এর পরবর্তী অবস্থান নিখুঁতভাবে অনুমান করতে পারে না।

৩. রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা (Stealth Features)

ফাতাহ-২ অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়তে পারে, যা রাডারের ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা দৃষ্টিসীমার নিচে থাকে। এছাড়া হাইপারসনিক গতিতে চলার সময় ক্ষেপণাস্ত্রের চারপাশে প্লাজমার একটি স্তর তৈরি হয়, যা রাডার তরঙ্গকে শোষণ করে নেয়। একে বলা হয় ‘প্লাজমা স্টিলথ’। ফলে এটি রাডারের স্ক্রিনে প্রায় অদৃশ্য থাকে যতক্ষণ না এটি লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছে পৌঁছায়।

৪. লিকুইড ফুয়েল ও সলিড প্রপেল্যান্টের সমন্বয়

ফাতাহ-২ ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিনে উন্নত সলিড প্রপেল্যান্ট ব্যবহার করা হয়েছে যা একে মুহূর্তের মধ্যে সর্বোচ্চ গতিতে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় ধাপে এটি লিকুইড ফুয়েল ইঞ্জিন ব্যবহার করে তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দ্বি-স্তরীয় জ্বালানি ব্যবস্থা একে দীর্ঘ পাল্লা এবং নিখুঁত আঘাতের ক্ষমতা দান করে।

আরো পড়ুন- “ফাতাহ-২ ঠেকানো প্রায় অসম্ভব”

৫. সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন

ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত তৈরি করা হয়েছে ধীরগতির রকেট বা নির্দিষ্ট পথে চলা ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্য। কিন্তু ফাতাহ-২-এর মতো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল ঠেকানোর মতো প্রযুক্তি বর্তমানে খুব কম দেশের কাছেই আছে।

  • মিলিটারি ওয়াচ-এর মতে, ফাতাহ-২ বিশ্বের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে এমন একটি ‘গ্যাপ’ তৈরি করেছে যা পূরণ করা আমেরিকার তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ বা ‘থাড’ (THAAD) সিস্টেমের পক্ষেও কঠিন।
ফাতাহ-২ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যান (এক নজরে)

বৈশিষ্ট্যবিবরণ
সর্বোচ্চ গতিম্যাক ১৫ (১৮,৫২২ কিমি/ঘণ্টা)
পাল্লা১,৪০০ থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার
প্রযুক্তিহাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV)
নির্ভুলতা১০-২৫ মিটারের মধ্যে (নিখুঁত আঘাত)
বিস্ফোরক বহনউচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কনভেনশনাল ওয়ারহেড

উপসংহার

ইরানের ফাতাহ-২ কেবল একটি মরণাস্ত্র নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ও বটে। এটি প্রমাণ করেছে যে, চরম নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। বর্তমান সংঘাতে এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সামরিক মানচিত্রকে ওলটপালট করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।