রাজনীতিতে বসন্তের কোকিল অনেকেই হন, কিন্তু তপ্ত রোদে আর উত্তাল রাজপথে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেন কজন? এমন প্রশ্নের উত্তরে বর্তমানে বিএনপির রাজনীতির অন্দরমহলে একটি নামই বারবার আলোচিত হচ্ছে—হালিমা খান লুসি।
বালুর ট্রাক থেকে ৩৬শে জুলাই:
বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় যখন বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে গুটিকয়েক কর্মী রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের অন্যতম হালিমা খান লুসি। ১/১১-এর সেই কঠিন সময় থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ৩৬শে জুলাইয়ের ফ্যাসিস্ট পতনের বিপ্লব—সবখানেই তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় সৈনিক। দীর্ঘ ৩৩ বছরের এই রাজনৈতিক পথচলায় কখনো জেল-জুলুম, কখনো রাজপথের বাধা তাকে দমাতে পারেনি।

রাজনীতির পাঠশালা: কুমুদিনী থেকে ঢাবি
হালিমা খান লুসির রাজনীতির হাতেখড়ি ১৯৯২ সালে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী কুমুদিনী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায়। শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তিনি ছাত্রদলের পতাকাতলে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্রী হিসেবে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে এক লড়াকু নাম হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি শামসুন্নাহার হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-মহিলা সম্পাদক হিসেবে রাজপথ কাঁপিয়েছেন ।

১/১১ এবং দুঃসময়ের সাহসী কান্ডারি
রাজনীতিতে অনেকের উত্থান সুবিধাজনক সময়ে হলেও হালিমা খান লুসি নিজেকে প্রমাণ করেছেন দলের চরম বিপর্যয়ে। ১/১১ পরবর্তী সময়ে যখন রাজনীতি ছিল এক প্রকার নিষিদ্ধ, তখন তিনি প্রেসক্লাব ভিত্তিক কর্মসূচিগুলোতে ছিলেন নিয়মিত মুখ। বিশেষ করে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় যখন বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ করা গুটিকয়েক কর্মীর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। গত ১৭ বছরের স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে, বিশেষ করে ৩৬শে জুলাই ফ্যাসিস্ট সরকারের পলায়নের আগ পর্যন্ত তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।

মেধা ও পাণ্ডিত্যের অনন্য সমন্বয়
কেবল রাজপথের স্লোগান নয়, হালিমা খান লুসি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (দর্শন) সম্পন্ন করেছেন。 উচ্চতর শিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট্রাল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন。 বর্তমানে তিনি বার কাউন্সিলের ভাইভা সম্পন্ন করে একজন সনদধারী আইনজীবী হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তার এই আইনি ও প্রশাসনিক জ্ঞান তাকে নীতি বিশ্লেষক হিসেবে দলের অভ্যন্তরে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে ।

নির্বাচনী কৌশলী ও সাংগঠনিক সাফল্য
হালিমা খান লুসি নিজেকে কেবল একজন নেতা নন, বরং একজন দক্ষ নির্বাচনী কৌশলী হিসেবেও প্রমাণ করেছেন । তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় পোলিং এজেন্ট ট্রেইনার এবং ক্যাম্পেইন ম্যানেজমেন্ট টিমের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন, বিশেষ করে ঢাকা-১৭ আসন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী আসনে এজেন্ট প্রশিক্ষণ ও নির্বাচনী প্রচারণায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া তিনি টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, ফেনী, ফরিদপুর ও পাবনাসহ ৫টি জেলার ২০টি সংসদীয় আসনের দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে দলের প্রার্থীরা আশাতীত সাফল্য পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

আগামী দিনের লক্ষ্য: অবহেলিতদের অধিকার
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত হলে হালিমা খান লুসির লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি দেশের ৫০ ভাগ নারী শ্রমিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জিডিপিতে তাদের অবদান নিশ্চিত করতে কাজ করতে চান। এছাড়া নারী, শিশু এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতে, হালিমা খান লুসির মতো শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিককে সংসদে পাঠানো হলে তা হবে দীর্ঘ ৩৩ বছরের ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন।তৃণমূলের দাবি, সংরক্ষিত নারী আসনে হালিমা খান লুসির মতো শিক্ষিত ও লড়াকু নেত্রীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা হবে দীর্ঘ ৩৩ বছরের ত্যাগের এক শ্রেষ্ঠ মূল্যায়ন।