শিশুদের নির্মল বিনোদনের উৎস খেলাধুলা
মডেলঃ শান

অতীতকাল থেকেই খেলাধুলা বিনোদনের নির্ভেজাল মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃত। বর্তমানকালে যদিও বিনোদনের হাজারো উপাদান-উপকরণ সৃষ্টি হয়েছে তবুও খেলার আবেদন এতটুকুও কমেনি। প্রত্যেকটি খেলাই যেন বিনোদনে ঠাসা। খেলাধুলা মানুষকে আনন্দ দেয়, উচ্ছ্বসিত করে তোলে। খেলাধুলা আমাদের আবেগ প্রকাশের একটি মাধ্যম।

খেলাধুলা কখনো কখনো মানুষকে হাসায়, কখনো বা কাঁদায়। তবে বিনোদনের খোরাক হিসাবে খেলার উপযোগিতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষ দূর দূরান্তে, এমনকি দেশের বাইরেও খেলা দেখতে যায়। তাই সন্দেহাতীত ভাবে খেলা নির্মল বিনোদনের উৎস।

দেশপ্রেমে খেলাধুলাঃ খেলাধুলা যে মানুষকে শুধুমাত্র বিনোদন দেয় তা নয় বরং আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এর সুদূর প্রসারী প্রভাব রয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যম্যে একটি শিশুর মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, সামাজিকীকরণ সুসংহত হয়। ব্যক্তিজীবনে খেলাধুলা মানুষকে সৎ, সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী, পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী করে তোলে। আবার জাতীয় জীবনে খেলাধুলা মানুষের মধ্যে ঐক্য, সংহতি, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ প্রবল করে তোলে। তাই খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরীতে ও খেলাধূলা সহায়ক ভুমিকা রাখে। আন্তঃদেশীয় সুসম্পর্কের সূচনা করে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, সহযোগীতা ও আস্থার সম্পর্ক খেলাধূলার মাধ্যম্যে তৈরী হয়ে থাকে।

শরীর গঠনে খেলাধুলাঃ খেলাধুলা মনকে প্রফুল্ল রাখে। শরীর ও মনকে রাখে প্রাণবন্ত, উচ্ছল ও আনন্দময়। সুস্বাস্থ্যের জন্য তাই খেলাধুলা একটি অতি আবশ্যকীয় দিক। খেলার মাধম্যে সামাজিকীকরণ ঘটে। মানসিক প্রশান্তি, মেদবহুল শরীর, রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার একটি জরুরী দিক হলো খেলাধুলা। খেলাধুলা করলে শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালিত হয় তাই সেগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে। এতে শারীরিক ব্যায়ামেরও কাজ হয়। খেলার মাধ্যম্যে শারীরিক পরিশ্রম হয়। এতে শরীর ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয় হয় ও মেদ কমে যায়। ফলে মানুষের হার্ট, মস্তিস্ক ভালো থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়। রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পায়।

খেলাধুলা মানুষের বিষন্নতা, অবসাদ কাটিয়ে মনকে চনমনে করতে সাহায্য করে। তাই খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতাই নয়, মানসিক, প্রশান্তি ও সুস্থতাও নিশ্চিত করে। শরীর গঠনে তাই খেলাধুলার কোন বিকল্প নেই। শিশুদের মুটিয়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার এবং দৈনিক কমপক্ষে এক ঘন্টা ঘাম ঝরিয়ে খেলাধুলা না করাকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, সুস্থ সুন্দর শরীর গঠনে শিশু কিশোরদের অলস সময় কাটানোর বদলে, ইনডোর খেলাধুলা ও গেম্সের বদলে আউটডোরে গেমসের প্রতি বেশী উৎসাহী করে তুলতে হবে। কেননা, সুস্থ দেহের জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলা খুবই প্রয়োজন। তাই যদি কেউ সুস্থ ও সবল থাকতে চায় তার জন্য খেলাধুলার কোন বিকল্প নেই।

 বিনোদনের উৎস খেলাধুলা। শান ও মাহবুবা রাখী
মডেলঃ মাহবুবা রাখী ও শান

মানসিক বিকাশে খেলাধুলাঃ শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলার ভুমিকা অনন্য। খেলাধুলা শিশু মনে এক ধরণের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, ফলে শিশু আনন্দময় পরিবেশে বড় হয় এবং মানসিক বিকাশে সহজ ও সাবলীল হয়ে উঠে। শিশু যখন খেলাধুলায় মগ্ন হয়ে তার সঙ্গির সাথে খেলার উপকরণ ভাগাভাগি করে তাতে তার মনের ভাব প্রকাশ হয়। এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল শিশু খেলাধুলা থেকে বিরত থাকে, অন্য শিশুদের থেকে তাদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

শৃঙ্খলাবোধে খেলাধুলাঃ মানব জীবনে অত্যাবশকীয় একটি দিক হলো শৃঙ্খলাবোধ। সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই শৃঙ্খলা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয়। কারণ, বিশৃঙ্খলা সমাজ ও রাষ্ট্রকে চরম নৈরাজ্যের মধ্যে ঠেলে দেয়। খেলাধুলা মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ তৈরী করে তাদের একটি সু-শৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্থ করে তোলে। খেলাধুলা করাতে যেসব শৃঙ্খলাবোধ তৈরী হয় তাতে দলের প্রতি অনুগত থাকতে হয়। নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। দলের অন্যদের সাথে ঐক্য তৈরি হয়। দলের প্রতি অনুগত থাকতে হয়। নিয়মিত অনুশীলন শরীরে একদিকে যেমন শৃঙ্খলাবোধ ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে তেমন শরীরকে শক্তিশালী ও নীরোগ করে তোলে। খেলাধুলার মাধ্যমে দলের প্রধান কিংবা প্রশিক্ষকের কথামত নিয়ম মেনে চলতে হয়, আর এসব করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ জন্ম নেয়। শৃঙ্খলাবোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে মানুষ একটি গোছানো, পরিপাটি জীবন যাপন করে নিজের উন্নতি সাধন করতে পারে।

চরিত্র গঠনে খেলাধুলাঃ একজন মানুষকে সুচরিত্র ও সুনাগরিক করে গড়ে তোলার ব্যাপারে খেলাধুলার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যম্যে মানুষের চরিত্রের মধ্যে দৃঢ়তা আসে, ব্যক্তিজীবনে ধৈর্যশীল ও সংযমী হয়ে উঠে। খেলাধুলায় জয়-পরাজয়ের গ্লানি থাকে বলে মানুষ জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই মেনে নিতে অভ্যস্থ হয়। খেলাধুলার মধ্যে ধোঁকাবাজি, ভন্ডামি এসব থাকে না বলে অন্যকে ধোঁকা দেয়া থেকে বিরত থাকে এবং ব্যক্তি জীবনে সততা আসে। খেলাধুলার মাধম্যে ব্যক্তির চরিত্রে আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় প্রত্যয়, অধ্যাবসায়ের মতো মানসিক গুনাবলীগুলো যুক্ত হয়।

মডেলঃ শান ও মাহবুবা রাখী

সম্প্রীতি বন্ধনে খেলাধুলাঃ খেলাধুলার মাধম্যে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরী হয়। খেলাধুলা করতে গিয়ে একজনকে আর একজনের সাহায্য সহযোগীতা নিতে হয়, ফলে আস্থা ও বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। সেই সম্পর্ক হলো সহযোগীতা সৌহার্দের ও সম্প্রীতির। খেলাধুলার মাধ্যম্যে শুধুমাত্র খেলোয়ারদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরী হয়, তা নয় বরং খেলার দর্শক সমর্থকদের মধ্যে একধরণের সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হয়।

জাতীয়তাবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধে খেলাধুলাঃ খেলাধুলার মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ তৈরি হয়। কারণ, খেলাধুলার মাধম্যেই আমরা জয় পরাজয়ে একত্রিত হয়ে যাই। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্টি নির্বিশেষে নারী পুরুষ সবাই এক পতাকার নীচে চলে যাই। বর্তমান সময়ে বিশ্বভ্রাতৃত্ব সৃষ্টিতে খেলাধুলা একটি কার্যকর মাধ্যম। খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপন হয়। এমনকি দুটি দেশের চলমান কোন দ্বন্দ¦ ও সংকট নিরসন, বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক স্থাপন হয় খেলাধুলার মাধ্যমে। খেলাধুলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুটি দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। ফলে, দুটি দেশের মধ্যে গড়ে উঠে ভ্রাতৃত্ব।

সাংস্কৃতিক বিনিময়ে খেলাধুলাঃ খেলাধুলার মাধ্যম্যে দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সকলের সামনে উপস্থাপন করা হয়। দেশীয় কিছু ঐতিহ্যবাহী খেলা পুরোদমে নিজ দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরী করে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান করে।

অতিরিক্ত খেলাধুলার কুফলঃ কোন কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়, মানুষের শরীরের পক্ষে। অতিরিক্ত খেলার কারণে সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয় ঘটে। ছাত্র/ছাত্রীদের শিক্ষাজীবনে ধস নেমে আসে। আবার অতিরিক্ত খেলাধুলার উত্তেজনায় কারো কারো স্বাস্থ্যের অবনতি সহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। খেলাধুলা মানুষের জীবনকে একদিকে যেমন নির্মল আনন্দ দেয়, অন্যদিকে তেমনি জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে। সুস্থ জাতি গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম। একমাত্র খেলাধুলার মাধ্যম্যেই ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও সুস্থ শরীর গঠন সম্ভব। খেলাধুলা সমাজ থেকে সন্ত্রাস দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। সু-নাগরিক গড়ে হিসাবে জাতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খেলাধুলার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

(সংগৃহীত)