দীর্ঘ ২৫ বছর কারাগারে থাকার পর গত মাসের শুরুতে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ, এলাকায় যিনি পরিচিত “কাইল্যা পলাশ” নামে।
মুক্তির এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে নতুন করে আধিপত্যের লড়াইয়ের সম্ভাবনা সামনে এনেছে।
ঘটনার বিবরণ: নামাজ পড়ে ফেরার পথে গুলি
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বেলা পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় নামাজ আদায় করে বাসায় ফেরার পথে পলাশ হামলার শিকার হন। রামপুরার একটি পরিচিত মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তার মাথা লক্ষ্য করে পরপর দুটি গুলি চালায়। গুলি করার পরপরই হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে চড়ে এলাকা থেকে পালিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ পলাশকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং হামলায় অংশ নেওয়া সন্দেহভাজনদের একজন ইমাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হামলার নেপথ্যে কারা এবং ইমাম হোসেনের প্রকৃত ভূমিকা কী, তা এখনো তদন্তের বিষয়।
কে এই কাইল্যা পলাশ?
ইয়াসিন খান পলাশের অপরাধ জগতে প্রবেশ ও দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ। ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যাকাণ্ডে তিনি দণ্ডিত হন। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করে।
এখানেই তার বিতর্কিত অতীত শেষ নয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ মার্চ আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি গোলাম মোস্তফা টিপু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবেও পলাশের নাম উঠে এসেছিল। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ অন্তত ১০টি মামলা চলমান রয়েছে এবং তিনি ১৮ থেকে ২০ বছর কারাভোগ করেছেন।

কারাগারে থেকেও বিশেষ সুবিধা: এক চমকপ্রদ চিত্র
পলাশের কারাভোগের বিষয়টি নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। কাগজে-কলমে কারাগারে থাকলেও তিনি নিয়মিত মাসে দুই থেকে তিনবার জেলের বাইরে এসে পরিবারের সাথে সময় কাটাতেন। এমনকি হাতকড়া পরা অবস্থায় এলাকায় এসে গুলি চালানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
বিগত দুই বছরে শুধুমাত্র মামলার হাজিরার নামে তিনি ৫৩ বার ঢাকায় এসেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, হাজিরা শেষে নিয়মমাফিক প্রিজন ভ্যানে ফেরার পরিবর্তে তিনি মাইক্রোবাসে চড়ে রামপুরার বাসায় গিয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটাতেন। এই তথ্য তার স্ত্রী মাহমুদা খানম নিজেই স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
এর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হলো, বারবার রোগী সেজে কারাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ নিয়ে ২০১২ সালের অক্টোবরে মুন্সিগঞ্জ হাসপাতালে তার ও স্ত্রীর একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। অর্থাৎ, ২৫ বছর কারাগারে থাকার পরও তার বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে, যা কারা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ বলে মনে করছেন অনেকে।
কেন এই হামলা? সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, পলাশের ওপর হামলার পেছনে দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, প্রতিদ্বন্দী গ্যাং। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে যারা রামপুরা এলাকা ও স্থানীয় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, তারা ধরে নিয়েছিল পলাশ জেল থেকে বের হলে আবার তার পুরোনো প্রভাব ও আধিপত্য ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এই আশঙ্কা থেকেই প্রতিদ্বন্দী গ্রুপ আগেভাগেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আশ্রয় হারানো। এই ধরনের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পেছনে সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাব বা ছায়া কাজ করে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন বা সরকার বদলের কারণে সেই ছায়া সরে গেলে, পুরোনো সহযোগীরাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় হুমকি বা শত্রুতে পরিণত হয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এটিই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে গত এপ্রিলে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটন ২০ বছর জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পান এবং মুক্তির ২০ মাসের মাথায় প্রায় একই কায়দায় খুন হন। এই ধারাবাহিকতা একটি স্পষ্ট প্যাটার্নের দিকে ইঙ্গিত করছে— দীর্ঘমেয়াদি কারাভোগের পর মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরে এসে নিরাপদ থাকছেন না।
রামপুরা: সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বের পুরোনো কেন্দ্রভূমি
রামপুরা এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই এলাকায় একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেই চলেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে র্যাব-৩ এর একটি বড় অভিযানে হাতিরঝিল, রামপুরা ও খিলগাঁও এলাকার চাঁদাবাজির মূলহোতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান তুষার ওরফে “ভাগ্নে তুষার” সহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন তুষার ও তার বাহিনীর ভয়ে তটস্থ থাকতেন বলে জানা যায়।
এছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বরে পূর্ব রামপুরায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা আহত হন এবং অক্টোবরে রামপুরার একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাজাদা ওরফে সাজু ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘ কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান, যা পলাশের ঘটনার সাথে একটি মিল তুলে ধরে।
গণমাধ্যম ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া
প্রথম আলো, একাত্তর টিভি, কালের কণ্ঠসহ দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলো পলাশের ওপর হামলার ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছে। পুলিশ বলছে, হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে এবং গ্রেপ্তার হওয়া ইমাম হোসেনের সম্পূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
উপসংহার
কাইল্যা পলাশের ওপর হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি রামপুরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান সন্ত্রাসী দ্বন্দ্ব এবং কারাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ কারাভোগের পরও বিশেষ সুবিধা ভোগ করা, রাজনৈতিক ছায়ার ওপর নির্ভরতা এবং মুক্তির পর পুরোনো শত্রুতার মুখে পড়া- এই প্যাটার্ন বারবার ফিরে আসছে। নাইম আহমেদ টিটনের ঘটনার পর এখন পলাশ, একই প্রশ্ন আবারও সামনে আসছে- শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি এবং কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব।
- এই প্রতিবেদনটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। হামলার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে পুলিশি তদন্ত চলমান থাকায় ভবিষ্যতে তথ্য পরিবর্তিত বা সংযোজিত হতে পারে।










