তেহরান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ নিরসনে একটি স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত ট্রাফিকের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিবালয় থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই কঠোর অবস্থান জানানো হয়।
যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার বর্তমান অবস্থা
বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির ফলে বর্তমানে যুদ্ধ স্থগিত রয়েছে, যার মেয়াদ আগামী বুধবার শেষ হতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন পক্ষ আলোচনার টেবিলে অতিরিক্ত দাবি উত্থাপন এবং বারবার অবস্থান পরিবর্তন করার কারণে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন নীতিমালা
ইরান মনে করে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক লজিস্টিকসের বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ফলে যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। ইরান এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেবে:
- চলাচলকারী সমস্ত জাহাজের পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ।
- যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির উপযোগী বিধিমালা অনুযায়ী ট্রানজিট পারমিট ইস্যু করা।
- নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষা সেবার জন্য ফি আদায়।
- নির্দিষ্ট নেভিগেশন রুট বা চলাচলের পথ নির্ধারণ করে দেওয়া।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, শত্রু পক্ষ যদি জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে বা নৌ-অবরোধ আরোপ করে, তবে ইরান একে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করবে এবং প্রণালীটির সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ চলাচলের সুযোগ বন্ধ করে দেবে।
শর্তসাপেক্ষ বাণিজ্যিক চলাচলের সুযোগ
গত শুক্রবার ইরান বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য শর্তসাপেক্ষে প্রণালীটি খুলে দেয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে হামলা বন্ধের শর্ত মেনে নিয়েছিল, যা ছিল ইরানের একটি অন্যতম প্রধান দাবি। তবে মার্কিন নৌ-অবরোধ বজায় থাকলে ইরান এই সুযোগ প্রত্যাহার করে নেবে।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করার পর এবং মার্কিন পক্ষের নতুন কিছু প্রস্তাব পাওয়ার পরই বাণিজ্যিক চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সামরিক জাহাজ এবং “শত্রু দেশগুলোর” সাথে যুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর প্রবেশাধিকার যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকবে।
অবিশ্বাসের ছায়ায় কূটনীতি
ইরান জানায় যে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবগুলো এখনও পর্যালোচনা করছে। যুদ্ধের ৪০তম দিনে ইরান আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়েছিল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের দেওয়া ১০-দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে মেনে নেন। তবে ইসলামাবাদের ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় ওয়াশিংটন পুনরায় “অতিরিক্ত দাবি” উত্থাপন করায় অচলবস্থার সৃষ্টি হয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জোর দিয়ে বলেছে যে, ইরানি জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক প্রতিরোধের মুখে যুদ্ধের দশম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির অনুরোধ পাঠাতে শুরু করেছিল। চূড়ান্ত শান্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না।
সূত্রঃ প্রেস টিভি







