গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ যখন ইসলামাবাদের আলোচনা শেষ করে ফিরছিলেন, তখন তাদের মুখে ছিল কৃত্রিম হাসি।
তারা আগে থেকে লিখে রাখা একটি স্ক্রিপ্টেই অটল ছিলেন: আলোচনাকে ব্যর্থ ঘোষণা করা, ইরানকে আরেকটি ‘উত্তর কোরিয়া’ হিসেবে চিত্রিত করা এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই আলোচনাকে তেহরানের “অযৌক্তিক জেদ”-এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা।
কিন্তু তারা যখন তাদের নির্ধারিত ভূমিকা পালন করছিলেন, ইরানের মিডিয়া কূটনীতি এবং কূটনীতিকরা তখন ব্যস্ত ছিলেন একটি ভিন্ন আখ্যান তৈরিতে — যার ভিত্তি ছিল সত্য এবং প্রতিরোধ।
ফলাফলস্বরূপ, ২০২৬ সালের ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যা ঘটেছিল, তার ইরানি বয়ান কেবল পশ্চিমা সংস্করণের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের কভারেজে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এটি প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রকেও নতুন রূপ দিয়েছে।
ইসলামাবাদ আলোচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ওই দুই দিন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের বুক চিরে কয়েক দশকের সবচেয়ে সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল — পাকিস্তান যা ছিল ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। ইরানের বিরুদ্ধে টানা ৪০ দিনের আগ্রাসনমূলক যুদ্ধের পর এই আলোচনা শুরু হয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই ইভেন্টটি পূর্ববর্তী অনেক আলোচনা থেকে আলাদা ছিল কেবল এর রাজনৈতিক উপাদানের জন্য নয়, বরং মিডিয়া কূটনীতির আমূল পরিবর্তনের কারণে। ইরান-মার্কিন উত্তেজনার ইতিহাসে এই প্রথম ইভেন্টের মূল উৎস, এজেন্ডা নির্ধারণ এবং ঘটনার নাড়ি নক্ষত্র ইরানি গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
মিডিয়া আধিপত্যের ভূমিকা: দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি
ইসলামাবাদের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এমন এক সময়ে শুরু হয় যখন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছিল। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় সপ্তাহের উস্কানিহীন ও অবৈধ হামলার পর এই যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
সেই আগ্রাসনের জবাবে ইরানও চূড়ান্ত পাল্টা জবাব দিয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল — যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
আলোচনা শুরুর আগে ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ দফার একটি প্রস্তাব পেশ করে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত এই প্রস্তাবের মূল শর্তগুলোর মধ্যে ছিল: ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো আগ্রাসন না চালানোর গ্যারান্টি, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতি, সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জাতিসংঘ ও আইএইএ-র ইরান বিরোধী সব প্রস্তাব বাতিল, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।

প্রতিরোধের মিডিয়া কূটনীতির পতাকা: প্রেস টিভি
এই আখ্যানের লড়াইয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যম — বিশেষ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আনুষ্ঠানিক ইংরেজি চ্যানেল প্রেস টিভি — অনন্য ভূমিকা পালন করেছে।
২৫ শে মার্চ প্রেস টিভি একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশ করেছিল যে, ইরান তখনই যুদ্ধ শেষ করবে যখন তারা নিজে সিদ্ধান্ত নেবে এবং তাদের শর্ত পূরণ হবে। ট্রাম্পকে যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করতে দেওয়া হবে না।
প্রেস টিভির একচেটিয়া প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইরানের কাছে আলোচনার অনুরোধ করেছিল এবং এমন কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল যা যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার পরাজয়ের বাস্তবতার সাথে অসংগতিপূর্ণ ছিল।
ইরান এই প্রস্তাবগুলোকে একটি ফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করে প্রত্যাখ্যান করে।ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে, যতক্ষণ না আগ্রাসন ও সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হচ্ছে, যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো আলোচনা হবে না।
এই জোরালো প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং আলোচনার বিষয়ে প্রেস টিভি বিশ্বের এক নম্বর রেফারেন্সের উৎসে পরিণত হয়।
বিশ্লেষণে আধিপত্য: পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের পিছুটান
অন্যান্য সময়ে মূলধারার পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম যেমন নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন বা বিবিসি “মার্কিন একপাক্ষিকতা” এবং “আমেরিকান মধ্যস্থতাকারীদের বীর” হিসেবে তুলে ধরে। এবারও তারা ইরানের “একগুঁয়েমি” নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
কিন্তু এবারের পার্থক্য ছিল এই যে — প্রেস টিভির নেতৃত্বে বিকল্প আখ্যানগুলো বিশ্বজুড়ে এতটাই জায়গা করে নিয়েছিল যে, বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো আলোচনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানতে ইরানি উৎসগুলো ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল।
ইরানি প্রতিনিধি দলের সাথে থাকা ‘ফারহিকেফতেগান’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিন ইমানজানি বলেন, “এবার মিডিয়া টিম আগের চেয়ে অনেক ভিন্নভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। আমরা ঘটনার মূল উৎসে পরিণত হতে চেয়েছিলাম।”
আরো জানতে পড়ুন- ইরান সেনাবাহিনী দিবস: নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির প্রশংসা
মিডিয়া কূটনীতির ৩৬০-ডিগ্রি কৌশল
ইসলামাবাদে ইরানের মিডিয়া কৌশল পাঁচটি স্তরে কাজ করেছে: গণমাধ্যম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিক, সামরিক কমান্ডার এবং আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল অঙ্গন।
প্রেস টিভির ভূমিকা আইআরআইবি (IRIB)-এর বৃহত্তর ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। প্রেস টিভি ছাড়াও হিস্পান টিভি (স্প্যানিশ), আল-আলম (আরবি) সহ ৩০টি ভাষার রেডিও ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ইরানের এই পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি বা জন-কূটনীতির হাত হিসেবে কাজ করেছে।
যদিও পশ্চিমা বিশ্ব আইআরআইবি-র ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এমনকি যুদ্ধের সময় তেহরানে এর ভবনে বিমান হামলা পর্যন্ত হয়েছে, তবুও তারা তথ্যপ্রবাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের এই আধুনিক ডিজিটাল কূটনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ব্যবহারও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন দেশের ইরানি দূতাবাসগুলো হাস্যরস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ট্রাম্পের হুমকির জবাব দিয়েছে।
ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এ নিয়ে লিখেছে: “ভাইরাল হচ্ছে ইরান: সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধে ইরান প্রযুক্তি-আসক্তদের হারিয়ে দিচ্ছে।”
উপসংহার: ইসলামাবাদের শিক্ষা
ইসলামাবাদ আলোচনা প্রমাণ করেছে যে, সঠিক কৌশল এবং সত্য তথ্যের সরবরাহ থাকলে ইরানি মিডিয়া বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রেস টিভি দেখিয়েছে যে, তারা কেবল পশ্চিমা মিডিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করে না, বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রাথমিক রেফারেন্স বা মূল উৎসে পরিণত হতে পারে।
ইরান দেখিয়েছে যে, আধুনিক যুদ্ধের যুগে মিডিয়া কূটনীতির অস্ত্র সামরিক শক্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি ৪০ দিনের যুদ্ধটি হার্ড পাওয়ারের পরীক্ষা হয়ে থাকে, তবে ইসলামাবাদ ছিল সফ্ট পাওয়ার বা নরম শক্তির পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় জয়ী হয়েছে ইরানি মিডিয়া।
লেখক: শেইদা এসলামি তেহরান-ভিত্তিক একজন লেখক, মিডিয়া উপদেষ্টা এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক।
(এই নিবন্ধে ব্যক্ত মতামত প্রেস টিভির নিজস্ব নীতিমালার প্রতিফলন নাও হতে পারে।)







