স্বপ্নের ফেরিওয়ালা আনিসুল হক

আজ ৩০ নভেম্বর। ২০১৭ সালের এই দিনে অকাল প্রয়াত হন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) সফল ও জনপ্রিয় মেয়র আনিসুল হক। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ওই বছর ৩০ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আনিসুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি অসংখ্য প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা ঢাকাবাসীর মনে তাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন: সংগ্রাম থেকে উঠে আসা

আনিসুল হক ১৯৫২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে নানাবাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে।

তিনি ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী বাবার সন্তান। মা-বাবা এবং চার ভাই-বোন নিয়ে তাদের পরিবারে বাবার স্বল্প আয়ের সংসারে ছিল নিত্যদিনের সংগ্রাম। এই সংগ্রামী পরিবেশেই মেয়র আনিসুল হক বেড়ে ওঠেন।

  • শিক্ষা: তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

বহু পরিচয়ের দ্যুতি: উপস্থাপক, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতা

আনিসুল হক ছিলেন একাধারে সফল ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক এবং সবশেষে জনপ্রতিনিধি। তার পদচারণা ছিল যেসব অঙ্গনে, সেখানেই তিনি নিজের মহিমায় দ্যুতি ছড়িয়েছেন।

  • ব্যবসায়ী: উপস্থাপনার জগৎ থেকে তিনি মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান হন এবং দেশের একজন জনপ্রিয় ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে ভূমিকা:

২০০৫-০৬ সেশনে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)-এর সভাপতি নির্বাচিত হন।

২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

টিভি উপস্থাপক হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা

আশির ও নব্বইয়ের দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবে আনিসুল হকের সুনাম ও পরিচিতি ব্যাপক ছিল। বিশেষ করে ৮০-এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত তার উপস্থাপিত ‘বলা না বলা’ এবং ‘জানতে চাই’ অনুষ্ঠান দুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

তবে উপস্থাপক হিসেবে তার জনপ্রিয়তার শিখরে আরোহণ ঘটে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারিত ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামের একটি এক পর্বের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা প্রথম এবং শেষবারের মতো একসঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসেন। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই আনিসুল হক সাধারণ মানুষের কাছে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা পান।

মেয়র হিসেবে স্বপ্নযাত্রা: স্বল্প সময়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ

আনিসুল হক ডিএনসিসির মেয়র হিসেবে মাত্র দুই বছর দুই মাস ২৪ দিন দায়িত্ব পালন করেন। এই অত্যন্ত স্বল্প সময়ে তিনি রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ‘স্মার্ট’ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বহু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। ঢাকাবাসীকে তিনি একটি বিশ্বমানের নগরী গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যার অনেক কাজ তার আকস্মিক প্রয়াণে অসমাপ্ত রয়ে যায়।