পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী থেকে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। এতে নদীর পাড় যেমন ভাঙনের শিকার হচ্ছে, তেমনি গতিপথ বদলে যাওয়াসহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য।

অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগও পুরোনো। কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় কিছুতেই নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা।

রিভার ও ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার ‘বাংলাদেশের বালুমহালের সার্বিক চিত্র ২০২৩’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২৬৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নদ-নদী থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বালু উত্তোলন করছে। যাদের মধ্যে ৫২ জন সরাসরি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতা; ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

ওই প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, দেশে নদীগুলোতে মোট ৭০৭টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮১টি লিজ দিয়েছে সরকার। অবশিষ্ট ৩২৬টির মধ্যে ১৪২টি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ শনিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের কোন নদীতে কী পরিমাণে বালু আছে, সেগুলোর কতটুকু উত্তোলন করা যাবে এবং কোথা থেকে তোলা উচিত এ ব্যাপারে কোনো সমীক্ষা নেই। অথচ সরকার দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৭০৭টি স্থানকে বালুমহাল ঘোষণা করেছে। এর ৫৪ শতাংশ আবার বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। এগুলোর বাইরেও ৭৭টি নদীর ১৪২টি এলাকা থেকে প্রভাবশালীরা বালু উত্তোলন করছে। তারা ইজারা নিচ্ছে এক জায়গার, বালু তুলছে আরেক জায়গা থেকে। ফলে নদী ও বসতি এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

নদী গবেষকরা বলছেন, কোন নদী থেকে কতটুকু বালু উত্তোলন করা যাবে তার একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করতে হবে। হাইড্রোগ্রাফি সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই বালু উত্তোলন করতে হয়। এ ধরনের সমীক্ষা ছাড়া বালু উত্তোলন করলে নদী ও জলাভূমি নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এ তথ্য কখনই উন্মুক্ত করা হয় না। যদিও বালু উত্তোলনকারীরা ঠিকই খোঁজ রাখে এসব তথ্যের। যদি সাধারণ মানুষেরও এসব তথ্য জানা থাকে, তাহলে অবৈধ উত্তোলনকারীদের প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

বিশ্ব নদী দিবস

মোহাম্মদ এজাজ বলেন, নদীগুলোকে রক্ষা করা জরুরি। ১৪২টি অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় শুধু মেঘনা নদীতে একটি ছাড়া অবৈধ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। বরং আমরা দেখেছি সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, স্থানীয় প্রভাবশালী এমপি, চেয়ারম্যানরা এ কাজে জড়িত। কতজন জড়িত তাদের নাম ও তালিকা আমরা প্রকাশ করেছি।

নদীবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ভাটির দেশ। ওপর থেকে পানির সঙ্গে পলিও আসে; যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য জরুরি। তাই নদী রক্ষায় যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হয় এবং পলি জমতেই থাকে, তাহলে তা নদী ভরাটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যা বালু উত্তোলনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই বালু ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি সরকারকে এখনই ভাবতে হবে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো বারবার ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ অবৈধ বালু উত্তোলন। সমস্যা হলো নদী থেকে বালু উত্তোলনের সিদ্ধান্ত দেয় জেলা প্রশাসন। যাদের কোনো কারিগরি জ্ঞান নেই। তারা পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যে মতামত নিয়ে থাকে তা সঠিকভাবে প্রতিপালন করে কিনা এটা দেখার কেউ নেই। তাই দেখা যাচ্ছে, যে পরিমাণ বালু উত্তোলনের সুপারিশ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাস্তবে তার থেকে বেশি বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে নদীর তীর ভেঙে যায়।

তিনি আরও বলেন, বালু উত্তোলনের বিষয়টি পাউবো ও বিআইডব্লিউটিএর অধীনে দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সমীক্ষা ও পর্যালোচনা করে কাজটি করতে হবে।

বিশ্ব নদী দিবস ২০২৩

আজ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস। বিশ্বের সব নদী রক্ষার তৎপরতার অংশ হিসেবে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ রবিবার পালিত হচ্ছে এ দিবস।

১৯৮০ সালে কানাডার খ্যাতনামা নদীবিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলো দিনটি ‘নদী দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ নদী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরি করতে ‘জীবনের জন্য জল দশক’ ঘোষণা করে। সে সময়ই জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে। এরপর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে, যা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব নদী দিবসকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

নদীর জন্য স্বাস্থ্য কার্ডের দাবি

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে বিশ্ব নদী দিবস-২০২৩ এর প্রতিপাদ্য ‘নদীর অধিকার’ নিয়ে আয়োজিত যৌথভাবে আলোচনা সভা আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং নদী রক্ষাবিষয়ক ১২টি সংগঠন। এতে নদীর অধিকার আদায়ের জন্য নদীর সামগ্রিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠন ও নদী গবেষকরা। একই সঙ্গে দখলদার মুক্ত করা ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া ও নদীতে প্লাস্টিকদূষণ বন্ধে পর্যটন এলাকা এবং জাহাজে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন বক্তারা। তারা নদীর দূষণের অবস্থা জানতে নদীর জন্য স্বাস্থ্য কার্ড করারও দাবি জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, আদালতের রায় অনুযায়ী নদীকে প্রবহমান করতে হবে। বর্তমানে শিপবিল্ডিংয়ের কারণে দূষণ হচ্ছে। দূষণের অন্যতম উৎস ভূমি। জাহাজ থেকে দূষণ হয় ৫-৭ শতাংশ। ঢাকায় ১৩০টি দূষণের উৎসমুখ চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বন্ধ করলে ঢাকায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে যাবে। শিল্পকারখানাগুলোকেও আইন মেনে বর্জ্য নিঃসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশের নদ-নদীগুলোর স্বাস্থ্য কেমন আছে, তা নিয়মিতভাবে তদারকি ও বোঝার জন্য রিভার হেলথ কার্ড তৈরি করতে হবে। ওই কার্ড থেকে বোঝা যাবে নদীগুলোর পরিবেশগত ও নাব্যতার স্বাস্থ্য খারাপ নাকি ভালো হলো।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, যথাযথ সমীক্ষা ও জনমত যাচাই ছাড়া কোনোভাবেই বালুমহাল ইজারা দেওয়া যাবে না। ইজারাদার ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিকভাবে যেন ব্যবস্থা নেওয়া যায়, এজন্য হটলাইন চালু করতে হবে। যাতে জনগণ অভিযোগ পৌঁছাতে পারে। অনেক জায়গায় দেখেছি আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হয়। এমনকি লিজ বাতিল হওয়ার পরও রাতের অন্ধকারে বালু ও পাথর তোলা হয়। তাই এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে জনগণ প্রশাসনের কাছে যেতে পারে এবং প্রশাসনকে সাহায্য করতে পারে।

সূত্রঃ প্রতিদিনের বাংলাদেশ