Divorce! তোর মাথা ঠিক আছে? মোবাইলের অপর প্রান্তের ঝাঝালো কণ্ঠের প্রতি উত্তরে নিতু শান্ত এবং দৃঢ়তার সাথে বলল yes, I want to divorce.
তুই তাড়াতাড়ি সব কাগজ পত্র ঠিক কর বলে ওর উকিল বন্ধু হেনার সাথে কথোপকথন বিচ্ছিন্ন করল।
সামনের টেবিলে ঢেকে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুখে দেয়ার আগ মুহূর্তে গতরাতের ঘটনাটা মনে করে মনটা আবার তেতো হয়ে গেল।
ছিঁড়ে যাওয়া মতির মালার মতো মূহুর্তের মধ্যে গ্লাস ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো।
নিতু অনেক টা হতভম্ব হলেও নিজেকে সামলে নিতো কিন্তু তমালের অকথ্য ভাষায় নিজেকে কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ওর মুখ দিয়ে ও অনর্গল খই ফোটার মতো কথা বেরিয়েছে।
সম্পূর্ণ পরিস্থিতি মনের জানালায় দৃশ্যমাণ হওয়ায় চোখদুটো জ্বালা করে উঠলো নিতুর।নির্ঘুম রাতের অবসন্ন দেহটিকে চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলো কিছুক্ষণ।
অনর্গল বেজে যাওয়া মোবাইলের শব্দে তমালের ঘুম ভাঙে।বিছানার পাশেই পরে থাকা মোবাইলটি হাঁতড়ে নিয়ে দেখলো এলার্ম এর শব্দ।এলার্ম বন্ধ করার পাশাপাশি একটু মনে মনে অবাক হচ্ছিল নিতু তো প্রতিদিন ডেকে তোলে আজকে বিকল্প ব্যবস্থা। সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে গতরাতের ঘটনা মনে করে ভেবে নেয় নিতুর রাগের বহিঃপ্রকাশ এটা।
সকাল ৯টা, তমাল যথারীতি ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ব্রাশ হাতে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর হেঁটে সরি বলার জন্য নিতুকে খুঁজছিল।
বয়স্ক গৃহ পরিচারিকা ফুলির মা বুঝতে পেরে নিজ থেকেই বলল, আফায় আজকে বাবুদের স্কুলে দিয়া ঐখান থেইক্কাই অফিস যাইবো।
তমাল প্রতিউত্তরে ও আচ্ছা বললে ও মনটা খারাপ হয়ে যায়।
কি মনে করে ব্রাশ হাতেই বাচ্চাদের রুমে ঢুকে। বিছানা এখনো এলোমেলো কিন্তু পাশের ওয়্যার ড্রোব এর উপরে ভাঁজ করা দুই সেট কাপড় যেগুলো স্কুল থেকে বাচ্চারা এসে পরবে।
পড়ার টেবিলে আলাদা নাম লেখা খাতা গুলো তে হোম ওয়ার্ক দেয়া এবং কখন করবে সে সময় ও উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে।
অবাক হওয়া তমাল ভাবছিল কখন করে এই কাজ গুলো নিতু?
দুইটি বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে রেডি করে সাথে নিজে ও রেডি হয়ে আটটার মধ্যে বের হয়ে গেছে। প্রতিদিন অবশ্য বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় এসে টুকটাক কাজ করে ৯টা ১৫ তে বের হয়ে যায়।
তমাল গোসল করে প্রয়োজনীয় কাপড় গুলো হাতের কাছেই পেয়ে ঝটপট রেডি হয়ে নাস্তার জন্য টেবিলে লাল নীল দুই রঙের ছোট ছোট ঢাকনা দিয়ে ঢাকা খাবার কৌতুহলবসত খুলে দেখে একপাশে স্ন্যাকস যা বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে খাবে অন্য পাশে দুপুরের খাবার।
আলাদা রঙের ঢাকনা ব্যবহারের উদ্দেশ্য দুই বাচ্চার জন্য আলাদা নির্দেশনা।
নিজের প্লেটে হাত দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো ফুলির মা নিতু নাস্তা করে গেছে?
ফুলির মা প্রতিউত্তরে না বলাতে তমাল খাবার টা আস্তে করে ঢেকে রেখে দেয়।
হাতঘড়ি, চশমা, রুমাল সবকিছু নির্দিষ্ট স্থানেই পেয়ে গেল।অথচ কোনো একটি খুঁজতে আধ মিনিট দেরি হওয়ার অপরাধে কত কথা শুনতে হতো নিতুকে প্রায়ই ।
নিতু অফিস যাওয়ার সময় কতদিন যে মন খারাপ করে বেরিয়েছে, তমাল সে বিষয়টি মাথায়ই রাখে নি।
ব্রিফকেসের সব ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখে নেওয়ার সময় খেয়াল করলো পাওয়ার ব্যাংকের সাথে সেঁটে আছে গতরাতের খুঁজে না পাওয়া কাগজ টি।
নিতু বার বার বলছিলো, তমাল তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে, তোমার ড্রয়ারে কেউ হাত দেয়নি,তুমি কাগজ টি অন্য কোথাও রেখেছো।
হ্যাঁ, তমাল ব্রিফকেসে এতো উত্তেজিত ভাবে খুঁজেছিল যে,চোখেই পরেনি।
প্রতিটি সিঁড়ির ধাপকে এক একটি খাদ মনে হচ্ছে, হয়তো পা গুলো টলছে তাই। নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য তমাল রেলিং ধরে নামছে আর গতরাতের অশ্রাব্য কথা গুলো মনে করছে।
অফিসে বসে অনেক বার ফোন দেওয়ার পরও যখন নিতুর কোনো রেসপন্স পায়নি।
নিজ অপরাধ বোধে নুয়ে পড়া মাথাটায় কত কিছু উঁকি দিয়ে গেল তমালের।
স্বাধীনচেতা, বন্ধু বৎসল মেয়েটা কত স্বপ্ন নিয়ে সংসার জীবনে পা দিল।
দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির মায়াজালে নিজেকে আটকে রেখেছে বারোটি বছর ধরে। মোটামুটি স্বচ্ছল সংসারে ভালোভাবে থাকার জন্য নিতু নিজে ও অনেক পরিশ্রম করে।
সবই ঠিক না থাকলেও মানিয়ে নিয়েছে নিতু।সময় ভেদে তমালের অসংলগ্ন কথা গুলোই মানতে পারেনা।
তমাল নিজে ও তার আচরণের এই রূঢ়তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করে না।পৌরুষের মিথ্যা অহং নিজের মধ্যে লালন করে। কথায় কথায় অভিযোগ, রেগে যাওয়া এবং সর্বশেষ হাতিয়ার হিসেবে চরিত্রের মধ্যে কালি লেপন করতে একটুও বাঁধে না তার।
অফিস ছুটি হওয়ার দুই ঘন্টা আগেই বের হয়ে গেল নিতু।বাসে না গিয়ে রিকশায় উঠে বাড়িতে পরে হাজারো কাজের কথা মনে করে একটু আতংকিত ও হচ্ছে।
মাথার ভেতর মনে হয় লক্ষ্য কোটি জোনাকিপোকা বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে।
গতরাতের ঘটনাটি আগুনের লেলিহানের মতো জ্বলে উঠলো চোখের সামনে। রাগে আবার সমস্ত শরীর পুড়তে লাগলো।
রাস্তার একপাশে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে মা রিকশায় বসে, আর বাচ্চার বাবা রাস্তায় নেমে বেলুন ওয়ালার কাছ থেকে বেলুন নিয়ে বাচ্চাদের দেখাচ্ছে কোন রঙের বেলুন পছন্দ, বাচ্চারা ইতস্তত করায় সব গুলো বেলুনই কিনে নেওয়ায় বাচ্চারা খুশিতে সমানে হাততালি দিচ্ছে।
চলতি রিকশার দূর থেকে ক্রমান্বয়ে দৃশ্যটি স্পষ্ট হওয়ায় মনে হলো কেউ যেন কয়লার লাল গমগমে আগুনের মধ্যে পানি ঢেলে দিল।হঠাৎই নিভে যাওয়া আগুনের বাস্পায়িত কালো ধোঁয়া চোখ দু’টোকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল।
কিছু দূর যেতেই বহু পরিচিত অবকাঠামো দেখে রিকশা থামাতে বলল নিতু।
চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে ও পাখির কিচিরমিচির এর পাশাপাশি এখানে ওখানে বসে থাকা কোনো যুগল কিংবা জটলা করে বসে থাকা আড্ডার কোলাহল অস্পষ্ট কানে আসলে ও ঝাপসা চোখে তেমন ভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না কিছুই।
পায়ের তলায় পিষে যাওয়া শুকনো পাতার মর্মরতা কতো কিছুই মনে করিয়ে দেয় নিতু কে।
পরিচিত একটি জায়গায় বসতে গিয়ে ও অস্পষ্টভাবে একটি অবয়ব দেখে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে বসলো।
তমাল ও নিতু প্রায় আসতো এই লেকের ধারে। বাতাসে দুলে যাওয়া গাছের পাতার শব্দ,কোকিলের বিরহী সুর, উঁকিয়ে থাকা কোনো ফুলের রঙ,গন্ধ সবই খুব চেনা।
দীর্ঘক্ষণ বসে গল্প করা,বাদামের পাতলা আবরণ উড়িয়ে দেওয়ার মতো করে অভিমান উড়ানো কিংবা নিজেদের মধ্যে উষ্ণ আঁচ ভাগ করে নেওয়া, ইচ্ছে ঘুড়ির লাগাম ধরে করে যাওয়া খুঁনসুটি কিছুই বাদ রাখেনি।
স্বপ্ন এঁকেছে দু’চোখে,কখনো একে অপরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি গুলো কে ঢিল ছুঁড়ে লেকের জলে বৃত্তাকার আবদ্ধতায় বন্ধী করার খেলা খেলেছে।
প্রতিশ্রুতি!
হ্যাঁ, একটি সংসার নামক স্বর্গ গড়ার, একজন রেগে গেলে আরেক জন থেমে যাওয়ার, উভয়ের মতামতের মূল্যায়ন করার,….,……,
সর্বোপরি কেউ কাউকে ছেড়ে না যাওয়ার।
আনমনে নিতু পানিতে ঢিল ছুঁড়ছিল আর করে যাওয়া প্রতিশ্রুতি গুলো রোমন্থন করছিল।
অনেক আগেই ঢিল ছোঁড়া বন্ধ করা নিতুর সম্বিত ফিরে এলো অনতিদূরে টুপ টুপ টুপ… ঢিলের শব্দে।
দৃষ্টির স্ব্বচ্ছতায় কিছুটা দূরত্ব রেখে বসা অবয়ব টি স্পষ্টতর হলো।
বাকরুদ্ধ নিতুর দ্বিতীয় ডাকে শব্দটি বের হলো ত মা ল…
তমালের কান পর্যন্ত শব্দটা যাওয়ায় অবাক বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো নিতুর দিকে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের পথ কে মনে হলো কতো দীর্ঘ পথ তমালের কাছে…
লেখক-জেসমীন আক্তার








