মাঝে মধ্যে মনে হয়, ইচ্ছে হলেই দুই কদম পা বাড়িয়ে ছুঁয়ে নিতে পারি আমার সেইসব রঙিন স্মৃতি, যেমনটি ছুঁয়ে নিতাম গাছের কচি শাখে বসে থাকা প্রজাপতি কিংবা ঘাসফড়িং।
জোনাকির দল থেকে ও দু’একটা মুঠোয় নিয়ে যেভাবে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে আলো দেখার চেষ্টা করতাম, সেভাবেই শূন্য দুটি মুঠোয় চোখ রাখি,যদি এসে যায় সেই আলো, সেই ভাবনায়!
চোখ থেকে হারায় না,মাটিতে তিনটি গর্ত করে যেকোনো একটাতে তেতুল কিংবা লিচু বীজ ভরে বাকী দুইটা শুধু মাটি ভরে রেখে অপর প্রান্তের চোখ বন্ধ করে রাখা খেলার সাথীটিকে যখন ছেড়ে দেওয়া হতো,কোনটাতে বীজ আছে তা বের করার জন্য।
তখন অজানা অস্থিরতায় দোয়া পড়তে থাকতাম, যেন না খুঁজে পায়।কি ছেলেমানুষি!এক্কাদোক্কা খেলার কোড কিংবা মাটিতে গোল করে দাগ কেটে সাত গাছের পাতা জড়ো করা,মনে হয় এইতো কদিন আগের ঘটনা।
স্টিক এর ধাক্কা খেয়ে মার্বেল গুলো যত্রতত্র ছুটে নির্দিষ্ট গর্তে গিয়ে লুকানো, স্ট্রাইক এর সশব্দ ছোঁয়ায় ক্যারমের ফুল সাজানো গুটি গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে আল্পনা জুড়ে দিত,চোখের তারায় এখনো স্বমহিমায় লেপ্টে আছে।
পিনপতন নিস্তব্ধতায় দুই প্রান্তে দুই জন ঘাড় ঝুঁকিয়ে বসে থেকে যখন শুনতে হতো রাজা চেক, তখন ঘাড়টা আরোও নিচু হয়ে এপথ ওপথ দেখে বেড়াতাম, কোনদিক দিয়ে রাজাকে বের করা যায়।
অবরুদ্ধ দ্বার যখন সব জায়গায়, তখন সোজা হয়ে বসে সগৌরবে আত্মসমর্পণ করার এমন উত্তেজনাকর দাবা খেলাটি মগজ, মননে এখনো বয়ে বেড়াই।
প্রতিপক্ষের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলার জোড়ালো হাত ও পায়ে বড় হয়ে যাওয়ার নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, সেই কষ্ট এখনো কোনো এক কোণে গুটিশুটি মেরে চুপ করে বসে আছে।
অনেক বেশি বড় হয়ে যাওয়ার কারণ দর্শিয়ে যখন স্বাধীনতায় কারো হস্তক্ষেপ আসে,তখন ফোঁস করে ফনা বের হয়ে আসে।
ধীরে ধীরে ছেলেমানুষি গুলোকে চাপা দিয়ে আমি উর্ধগতিতে ছুটলাম।বই পড়ার মুগ্ধতায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখলাম, একাডেমিক পড়াশোনার প্রতিযোগিতা ও ঘাড়ে এসে জুটল।
মায়ের নির্ভেজাল ভালোবাসার অগ্নিমূর্তিটি চোখের তারায় স্থির থাকে সবসময়, কি ভয়ংকর ছিল সে রূপ!
আমার কোনো সন্তান যদি একবেলা না খেয়ে থাকে অসুখ কিংবা অভিমানে, আমি সুস্থ থাকতে পারিনা, মানসিক ভাবে খুব বিচলিত হই।
কোনো রাতে যদি হয়,আমি সে রাতে ঘুমোতেই পারিনা।
খাবার ঠিক মতো না খাওয়ার অভিযোগেই মা আমার তাঁর সারাদিনের কর্ম ক্লান্ত শরীরে কোনো মায়াবী আবেগ দিয়ে নয়,রাগান্বিত মুখটি দিয়েই তা প্রতিহত করতেন।
আমার মা ও অনেকটা চাপা পরে গেলেন, আমি উর্ধগতিতে উঠে আমার নবজাতক সন্তানের হাসি কান্না দেখি।দেখি তার সেকেন্ড মিনিটে বেড়ে ওঠা। দেখি কচি আঙুল, ফিনফিনে চুল।
মা আমার জানালার পাশে বসে অন্য বাড়ির পুঁইয়ের মাচায় কয়টি শাখা নতুন করে ছড়ালো তা দেখেন, বৈদ্যুতিক তারের মধ্যে কয়টি শালিক বসল,তা-ও দেখেন।
কখনো চার দেয়ালের মধ্যেই কাল্পনিক কাহিনী তৈরি করে তাঁর দূরে থাকা ছেলেমেয়েদের সংসার দেখে একাকিত্ব ঘুচানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
মা কি আদৌও চাপা পরলেন!
তা ও কি সম্ভব!
মা সর্বত্র প্রতিধ্বনি তোলেন, “আমি আছি তোর পাশে, তুই এগিয়ে যা।”
আমিও পরম নির্ভরতায় এগিয়ে যাই।
চাপা পরে যায় আমার প্রথম বসন্ত, প্রথম ভালোলাগা।
সময়ের বিবর্তনে আমি কত বসন্ত পার করে দেই রঙিন কোনো নতুনত্বে। কিছুটা দায়িত্ববোধ,কিছুটা অভ্যস্ততা,কিছুটা ভালোবাসায়।
প্রথম বসন্তের যে জলছাপ জীবন পাতায় আঁকা হয়ে গেছে, সে কি ম্লান হয়ে গেছে! আদৌও যায়!
সেও প্রতিধ্বনি তোলে,তোমার এগিয়ে যাওয়ার সাথে ভালো থাকা হয় যেন,শুভাশিষ সবসময়।
বুকে সাহস নিয়ে আরো উর্ধগতিতে এগোই।
এভাবেই চাপা পরে যায় ঝুম বৃষ্টি কিংবা জ্যোৎস্নায় স্নান করা।
স্কুল বেঞ্চ,কলেজ ক্যান্টিন।
কত বন্ধুদের চেহারা ম্লান হয়ে গেছে নতুনদের ভীড়ে।আদৌও কি ম্লান হয়!
আমি ছুটছি দুর্বার গতিতে উপরের দিকে।
অনেকটা সরু কূপের মতো,সব অতীতকে নিচে ফেলে।আমার একেকটা পদচিহ্নের ধাপ হয়ে ,প্রতিধ্বনি তুলে আমাকে সর্বদা এগিয়ে দিচ্ছে “জীবন” নামক কূপের তলানিতে পরে থাকা সেইসব দিন, ক্ষণ,মানুষ।
ঘন্টা, মিনিট যায়,অনেক কিছুই অতীত হয়।
স্বামী সোহাগ অতীত হয়,বাচ্চাদের হাসি কান্নাও অতীত হয়ে পরিপক্ক বোল ফোটে।
কচি আঙুল গুলোতে অভিজ্ঞতার ভাঁজ পরে।সেগুলো ও পেছনে ফেলে, আমি হাত পা ঝাপটে উর্ধগতিতে কূপের আলো মুখি স্তরে পৌঁছাতে চাচ্ছি।
আদৌও কি চাচ্ছি! কি জানি!
নীচে ফিরে না যেতে পারার অপারগতায়, একদিন ঠিক আলোমুখি পথ দিয়ে বের হয়ে অসীম শূণ্যতায় মিলিয়ে যাবো।
খুব কি আর বেশি সময় আছে!এই পৃথিবীর ধুলো,আলো, বাতাস
অতীত করে সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে যাওয়ার!
আহা জীবন!
লেখক- জেসমীন আক্তার











