Home গদ্য-পদ্য “ফকিন্নির পুত”- জেসমীন আক্তার

“ফকিন্নির পুত”- জেসমীন আক্তার

285
0
জেসমীন আক্তার

সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে হন্তদন্ত হয়ে যাওয়া যুবক ধাক্কা খেল অপর প্রান্ত থেকে আসা আরেকটি যুবকের সাথে।
ধাক্কা খাওয়া যুবকের মুখ থেকে অনেকটা পশুত্বের হুংকার বেরিয়ে আসে। অশ্রাব্য গর্জনে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়।
এদিকে ব্যস্ত যুবকটি অনেক টা ইচ্ছে করেই নিজ কাঁধে দায়ভার নিয়ে হাত জোর করে ক্ষমা চাচ্ছিল।

যুবক টি বুঝতে পেরেছিল প্রতিপক্ষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। উপস্থিত লোকজন পরিবেশ হালকা করার জন্য দুজনকে দুই দিকে সরিয়ে দিল।
নিজ নিয়ন্ত্রণ হীন যুবকটি পেছন ফিরে তার পরিচিত যুবকটিকে বলে গেল,
“ফকিন্নির পুত আজও মানুষ হইলি না”।
এদিকে ব্যস্ত যুবকের সেই কথা কানে দেওয়ার মতো সময় নেই, কারণ তার মা অসুস্থ। সেই খবর পেয়েই সে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছিলো।জেসমীন আক্তার-লেখক

সদ্যজন্ম দুই মানব শিশু পৃথিবীর আলো চোখ দুটোকে স্পর্শ করাতেই কেঁদে উঠেছিল।
প্রসব পরবর্তী যন্ত্রণায় কাতর হওয়া দুই মা- ই সমস্ত কষ্ট ভুলে তাদের বাচ্চাদের দুগ্ধ পান করিয়েছিলেন পরম মমতায়।
হ্যাঁ, এখানে ও পার্থক্য ছিল। একটা মায়ের ঘর ছিল সু- প্রাচীর আবরণ দ্বারা বেষ্টিত যেখানে তার বাচ্চাটি নিরাপদ নির্ভরতায় বড় হতে থাকলো।

অন্যদিকে,আরেকটি মায়ের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে রোদ,বৃষ্টির ঝাপটা, রাতে জোৎস্নার আলো ও ঢুকে পরে এমনই জীর্ণশীর্ণ ছিলো প্রাচীর।

কিন্তু মায়ের মমতার ওজন মাপবার বাটখারা কি তৈরি হয়েছিল কোথাও?
আস্তে আস্তে জীবন যুদ্ধ শুরু হয়,যার শরীরে আভিজাত্যের আতর মাখা, তাকে মানুষ হিসেবে বাঁচার লড়াই করতে হয়নি।
বাবার জমিদারিত্বে গা ভাসিয়ে দিব্যি জীবনটা কে মাতিয়ে রেখেছে। আতরের একঘেয়ে গন্ধ ভালো না লাগায় নিজেকে সমর্পিত করেছে এলকোহলের গন্ধে।

মানব কণ্ঠস্বরকে আরেকটু বেশি আভিজাত্যপূর্ণ করতে গিয়ে অনেকটা সিংহের গর্জন নিজ কন্ঠে ধারণের তীব্র অনুশীলন রেখেছে দেহমনে।

অপরদিকে,মনুষ্য ক্ষুধা নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটি বড় হতে থাকে মনুষ্য চাহিদা পূরণের লড়াই করতে করতে।
ছোট্ট তুলতুলে পায়ের জন্য তার মায়ের কিনে দেওয়া স্যান্ডেল জোড়া দিয়ে ও যখন রাস্তার ইট, সুড়কি, কাদা থেকে রেহাই পেতনা তার পদদ্বয়, শিশুটি বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝে নিয়েছিল,
এটাই নিয়ম!

এই কণ্টকাকীর্ণ পথের মধ্য দিয়েই তাকে বড় হতে হবে।
হয়েছিল ও তাই!

স্বপ্ন দেখেছিল কোনো একদিন বড় হয়ে চামড়ায় মোড়ানো সুন্দর জুতো পরার,জীর্ন জামার পরিবর্তে সুগন্ধিমাখা সুন্দর জামার।প্লেনে উঠার স্বপ্ন ও বাদ যায়নি তার নির্ঘুম রাতে।

হ্যাঁ, করেছিল পূরণ! দেখিয়েছিল বৃদ্ধাংগুলি ঠুনকো সমাজ ব্যবস্থাকে।
অন্যের কথার কালি মাখা কর্দমাক্ত শরীরটাকে সে ও ছুঁয়ে দিয়েছিল সমুদ্র স্নানে।
এর সব কিছুর জন্য শক্তি জুগিয়েছিল তার মায়ের মিঠে ওমে।

মায়ের জীর্ন শাড়ি গুলোকে ফেলে নতুন শাড়ি জড়িয়েছিল,কাজ করা শক্ত হাতে পরিয়েছিল সোনার কাঁকন, দেখেছিল তার মায়ের আভিজাত্য।

ছেলেটি বিশ্বাস করে তার শরীরে যে মানুষের মতো হাত,পা এবং তার অনুভূতি গুলো যে মানুষের মতো, সে যে মানুষের মতো শ্বাস প্রশ্বাসে অক্সিজেন নিতে পারে এগুলো স্বয়ং স্রষ্টা তার মায়ের মাধ্যমে তাকে দিয়েছেন।
মা,তার কাছে পুরো এক পৃথিবী।

অন্যদিকে, শক্ত পোক্ত জুতায় মোড়ানো যুবক এর এখন আর টাইট ফিট শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে ভালো লাগে না।
জমিদারিত্বে ভগ্নদশা, মা প্যারালাইজড।

তাতে কি! বাড়িতে তো ঝি-চাকরের অভাব নেই!

সে চায় রিলাক্স! সে হাত-পা ছড়িয়ে মানুষের মতো বাঁচে।

শুধু মানুষ হতে পারেনি সমাজের চোখে সেই যুবক, যে কর্মস্থল থেকে ঘর্মাক্ত হয়ে মায়ের আঁচলে এসে ঘাম মুছে, অচেনা পরিবেশে হাজার সালাম পেয়ে এসে ও পরিচিত জনের কাছে মানব অবয়বাকৃতির আলাদা নাম ধারী “ফকিন্নির পুত”।

লেখক~ জেসমীন আক্তার