চালের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে চুন প্রয়োগ করে ভাত রান্না করা হলে খাদ্যে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। আধা কেজি চালের সঙ্গে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত গ্রাম ঝিনুক চূর্ণের চুন দেওয়া যেতে পারে। রান্না করা চুনে ক্যালসিয়ামের খাদ্যমান ঠিক থাকে। তবে এই চুন সরাসরি খাওয়া যাবে না। আইসিডিডিআর’বির গবেষণায় দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা হলে শরীরের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটানো সম্ভব।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে এই তথ্য তুলে ধরেন আইসিডিডিআর’বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ। খাবারে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মোকাবিলা বিষয়ে বিআইডিএস মিলনায়তনে এই আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন ড. তাহমিদ আহমেদ।

 তিনি বলেন, দুধ হলো ক্যালসিয়ামের প্রধান উত্স। এছাড়া ব্রকলি, অরেঞ্জ জুস, চিয়া সিড, বিভিন্ন সবুজ সবজিতে আমরা ক্যালসিয়াম পাই। সমস্যা হচ্ছে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার ব্যয়বহুল। শুধু দরিদ্র মানুষ নয়, মধ্যবিত্তরাও এগুলো কিনে খেতে পারে না।

বিকল্প হলো ট্যাবলেট খাওয়া। কিন্তু সেখানেও সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে যে পরিমাণ মাতৃমৃত্যু হয় তার ২৪ শতাংশের কারণ হলো ক্যালসিয়ামের ঘাটতিজনিত রোগে। আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্হ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরাসরি চুন খেলে আলসারের মতো সমস্যা হতে পারে। ওরাল ক্যানসার এবং হাঁপানির কারণও হতে পারে। চুন হলো ক্ষার, এটা সরাসরি পানের সঙ্গে খাওয়া ঠিক নয়। এজন্য রান্না করে খাওয়া যেতে পারে।

পানের সঙ্গে চুন খাওয়ার বিষয়ে ড. তাহমিদ বলেন, যারা পানের সঙ্গে চুন খান তারা পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেলেন। কিন্তু তারা এর সঙ্গে তামাক বা জর্দা ব্যবহার করেন। এজন্য পানের সঙ্গে চুন খাওয়াকে আমরা সমর্থন করি না।

গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, মিরপুরে বাউনিয়া এলাকায় এক বছর ধরে ২২ জনের ওপর এই গবেষণা করা হয়েছে। তাদের চুন মিশ্রিত ভাত রান্না করে খাওয়ানো হয়। এতে দেখা গেছে, তাদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। তিনি বলেন, বছরে মাথাপিছু ২৫০ কিলোগ্রাম দুধ গ্রহণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ১৬ কিলোগ্রাম। নেপাল, ভারত, চিন, মিশর, পাকিস্তানের চেয়েও মাথাপিছু দুধ গ্রহণ হার বাংলাদেশে কম। দুধে ল্যাকটোজ থাকে।

বাচ্চারা এটা গ্রহণ করতে পারলেও বয়স্করা এটা পারে না। এজন্য সামর্থ্য থাকলেও অনেকেই দুধ খায় না। ড. তাহমিদ আরো বলেন, শিশুর জন্য ক্যালসিয়াম যেমন প্রয়োজন তেমনি বয়স্কদের জন্যও প্রয়োজন। শিশুদের হার গঠন ছাড়াও গর্ভবতীতের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন হলো ক্যালসিয়াম। বয়স্ক অনেকেই ধারণা করেন, বয়স হলে দুধ, ডিম খাওয়া যাবে না। কিন্তু এটা ঠিক নয়। খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়ায় তাদের শরীরের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যায়। তখন বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তাদের নিত্যদিনের খাবারে ১ হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয়। নিম্ন আর মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বেশি। ঝিনুক, শামুক এগুলোতে আমরা এলার্জি পাইনি।

মানুষ যদি এগুলো ব্যবহার করা শুরু করে তাহলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। তবে এটা নিয়ে আরো গবেষণা করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, একসময় অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান বলতেন, পুষ্টির ঘাটতি পূরণে স্পুরিলিনা দিয়ে ভাত খেতে। পুষ্টিমান থাকা সত্ত্বেও এটা জনপ্রিয় করা যায়নি। তবে আমাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে খাদ্যাভাসের পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

সূত্রঃ ইত্তেফাক