ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন একটি পণ্যবাহী ট্রাক গন্তব্যে রওনা দেয়, চালক জানেন তার খরচ শুধু জ্বালানি বা সরকারি টোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পথে পথে রয়েছে এমন কিছু ‘অদৃশ্য স্টপেজ’, যেখানে আইন নেই, আছে শুধু রশিদের বিনিময়ে টাকা আদায়ের অলিখিত নিয়ম। বর্তমানে এই চাঁদাবাজি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি ‘সমান্তরাল কর ব্যবস্থা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
১. প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজির মেকানিজম
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এখন এক সুশৃঙ্খল অপরাধে পরিণত হয়েছে। সড়ক মন্ত্রীর ভাষায় একে ‘পারস্পরিক সমঝোতা’ বলা হলেও বাস্তবে এটি একটি এক্সটরশন মেকানিজম।
- টোকেন ও স্টিকার সংস্কৃতি: নির্দিষ্ট সংগঠনের টোকেন বা কাঁচের স্টিকার না থাকলে ট্রাক বা বাসের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
- পয়েন্টভিত্তিক আদায়: জেলা শহর থেকে ঢাকা পৌঁছাতে একটি ট্রাককে ৫ থেকে ৭টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়। একে টার্মিনাল চার্জ বা লাইন খরচ বলা হলেও এর প্রকৃতি সম্পূর্ণ অবৈধ।
২. অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব (The Deadweight Loss)
চাঁদাবাজি সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত হানছে। বাজারে যখন পণ্যের দাম বাড়ে, আমরা ডলার সংকট বা বৈশ্বিক মন্দাকে দায়ী করি, কিন্তু ভেতরের কারণটি হলো এই অদৃশ্য কর।
- পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: সবজি ও নিত্যপণ্যের দামে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয় এই চাঁদাবাজির কারণে।
- বিনিয়োগে অনীহা: যখন একজন ব্যবসায়ী দেখেন আইনের চেয়ে স্থানীয় শক্তি বেশি প্রভাবশালী, তখন তিনি নতুন বিনিয়োগের সাহস হারান।
৩. অপরাধের আধুনিকায়ন ও ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’
অপরাধীরা এখন প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের পরিবর্তন করেছে। এখন আর কেবল নগদ টাকা নয়, বরং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) এর মাধ্যমে অনলাইন লেনদেনে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এতে অপরাধীদের শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
৪. কিশোর গ্যাং: অপরাধের নতুন ঢাল
একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো বড় বড় প্রভাবশালী গোষ্ঠী সরাসরি সামনে না এসে কিশোর গ্যাং-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন আইন প্রয়োগ জটিল হচ্ছে, অন্যদিকে একটি আস্ত প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অপরাধের সাথে জড়িয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।
৫. রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা ও সদিচ্ছার প্রশ্ন
সরকার বারবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কেবল চাঁদাবাজদের হাত বদল হয়েছে, কিন্তু শোষণমূলক কাঠামোটি আগের মতোই শক্তিশালী রয়ে গেছে। অপরাধকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সমাধানের পথ: কী করা প্রয়োজন?
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- সাক্ষী সুরক্ষা: ব্যবসায়ীরা যাতে ভয় না পেয়ে মামলা করতে পারেন, সেজন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করা।
- রশিদ ব্যবস্থা: সকল ফি সরাসরি রাষ্ট্রীয় রশিদে এবং নির্ধারিত হারে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদায় করা।
- কঠোর বার্তা: রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ।
উপসংহার
চাঁদাবাজি যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল অপরাধ থাকে না, সেটি হয়ে দাঁড়ায় ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’। যদি এই সমান্তরাল কর ব্যবস্থা এখনই বন্ধ করা না যায়, তবে দেশের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থা চিরস্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র: The Press24