জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ এবং আন্দোলনের অন্যতম আইকন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এই মামলার ৩০ জন আসামির সবাইকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছেন। রায়ে দুই সাবেক পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৫ আসামিকে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায়
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
যাদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন হলো
আদালতের রায় অনুযায়ী, সরাসরি গুলিবর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে:
- মৃত্যুদণ্ড: সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
এছাড়াও মামলার গুরুত্ব ও সম্পৃক্ততা বিবেচনায় তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে:
- যাবজ্জীবন: সাবেক এসআই বিভূতিভূষণ রায়, রংপুর পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান এবং সাবেক ইন্সপেক্টর রবিউল ইসলাম নয়ন।
অন্যান্য আসামিদের সাজার বিবরণ
মামলার অন্য ২৫ জন আসামিকে আদালত ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- ১০ বছর কারাদণ্ড: সাবেক উপাচার্য ডক্টর হাসিবুর রশিদ, মনিরুজ্জামান বেলটু, পলাতক মশিউর রহমান, আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং পমেল বড়ুয়া।
- ৫ বছর কারাদণ্ড: রাফিল হাসান, ইমরান চৌধুরী আকাশ, মাসুদুল হাসান, মাহবুবুর রহমান, ডা. মো. সারওয়াত হোসেন চন্দন, আবু মারুফ হোসেন, শাহানুর আলম পাটোয়ারী এবং শরিফুল ইসলাম।
- ৩ বছর কারাদণ্ড: রাসেল রহমান তুফান, মনিরুজ্জামান পলাশ, মাহফুজুর রহমান শামীম, ফজলে রাব্বি, আখতার হোসেন, সেজান আহমেদ আরিফ, ধনঞ্জয় কুমার টগর, বাবুল হোসেন, মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, নুর আলম মিয়া এবং একেএম আমির হোসেন।
আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, আসামি আনোয়ার পারভেজ আপেল এর হাজতবাসের সময়কে তার সাজা হিসেবে গণ্য করা হবে। অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে তাৎক্ষণিক কারামুক্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচার প্রক্রিয়া
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। ২০২৫ সালের ২৪ জুন এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
বিচারের মূল ধাপগুলো ছিল নিম্নরূপ:
- ৬ আগস্ট, ২০২৫: আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন।
- ২৭ আগস্ট, ২০২৫: প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু।
- ২৮ আগস্ট, ২০২৫: প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা মুকুল হোসেন।
- ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬: সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনসহ মোট ২৫ জন এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি প্রদান করেন, যা প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী মামলাটিকে শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার এই রায়কে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা। শহীদ আবু সাঈদের পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।
সূত্র ও ছবি: সমকাল







