Home গদ্য-পদ্য নারী শ্রম – জেসমীন আক্তার

নারী শ্রম – জেসমীন আক্তার

229
0
জেসমীন আক্তার
সূর্য ওঠা ভোরে, এলার্মের শব্দেই কোনো আড়মোড়া ভাঙা জড়তা ছাড়াই নিঃশব্দে উঠে যায়,পাছে তার ঘুমন্ত শিশু কিংবা অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা স্বামীর যেন কোনো রকম ব্যাঘাত না ঘটে।
চুলের বাঁধ টাকে কোনো রকম আঁটসাঁট করে,দুই উনুনে সমান তালে আঁচ বাড়িয়ে মেশিনের মতো নাড়তে থাকা হাত দুটো, কখনো ছুড়ি,কখনো মশলার বাটি কিংবা পাশেই সিংকের ছেড়ে দেয়া পানিতে এটা ওটা ধুয়ে হাড়িতে চাপানোর সময় চুলার গনগনে আলোয় নারী মুর্তিটি দেখা যায়, কি তার তেজ,আত্মবিশ্বাস, একাগ্রতা।
টেবিল ভর্তি করে প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজনের চেয়ে ও বেশী গুছিয়ে রাখতে রাখতে নিজের জলপানের আর সময় হয়ে ওঠে না।
কার ব্যাগে টিফিন যাবে,বইখাতা ঠিক মতো ঢোকানো হলো কি না,কাকে স্কুল যাওয়ার ভাড়া দিতে হবে,স্কুল ড্রেস গুলো আয়রন অবস্থায় আছে কি না এগুলো দেখার পাশাপাশি ও সন্তানদের নরম গলায় ঘুম থেকে তোলা, অসাবধান বশত সন্তানের বাবার ঘুম যেন না ভাঙে ,রাতে দেরীতে ঘুমিয়েছে কি এক টকশো দেখতে দেখতে, আধবোজা চোখে নারীটি ও দেখেছিল আর কি!
মিনিট সেকেন্ড হিসেব করে এগুনোর পর ও ঘড়ির কাঁটা আরও একধাপ এগিয়ে।
আয়নার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, আগোছালো চুলে দু একটা কাটা ক্লিপ আঁটকে, ড্রয়ার খুলে অর্ধ শেষ হওয়া লিপস্টিকটা ঘষে, ছোট্ট একটা ইয়ার রিং লাগিয়ে বের হওয়ার সময় ও স্বামীকে আলতো করে ডেকে তার প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো কোথায় কিভাবে আছে,অন্যান্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি দিয়ে যায়।
জেসমীন আক্তার-লেখক
বাস,ট্রামে ওঠার যুদ্ধ শেষ করে বসে তখন ও শরীরে ক্লান্তি নয়,মাথায় কাজ করে শাড়ির ভাঁজ করা কুচির মতো সাজানো কাজগুলো….
টাইম মতো পৌঁছাতে পারবে তো!
দেরী হলে বসের রাগান্বিত মুখটার সামনে স্মিত হাসিতে ইনিয়েবিনিয়ে কারণ বলার চেষ্টা,
টেবিলে একগাদা কাজ পরে আছে,
টাইমের মধ্যে শেষ হবে তো ইত্যাদি ইত্যাদি।
হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ফেরত নারী আবার এসে উনুন ঠেলে।
কোন বাচ্চা পিছিয়ে পরা,কার আসন্ন পরীক্ষা,সদ্য ঋতুমতী মেয়ের আলাদা পরিচর্যা,
ছুঁই ছুঁই যৌবনে পা দেয়া ছেলেটার গতিবিধি যেমন নজরে রাখা তেমনই বয়ঃসন্ধিক্ষনের ছেলেটার মেজাজ মর্জি বুঝে চলা নারী মাথা ঠান্ডা রেখে সমানতালে চলে মাসের ত্রিশ দিন।
ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের ক্লান্তিতে চনমনে ভাব আনে চোখে কাজল লেপে, রাত দুপুরের চকচকে আলোকে মায়াবী ভাব ধরে রাখতে ও যে পটিয়সি হতে হয়।
ফের সূর্য ওঠা, ছুটে চলা…
ছুটে চলা নারীটি বাইরে সালাম, সম্মান সব স্তরের মানুষ দ্বারাই কম বেশি পেয়ে থাকে, পারিশ্রমিক যা পায় সংসারের খুচরো হিসেবের খাতায় আগেই লেখা হয়ে থাকে।
কিন্তু নিজ হাতে ভালোবাসায় মোড়ানো চার দেয়ালের ভেতর!!!
অফিসের বড় কর্তা, চারপাশে জনা কয়েক কর্মকর্তাকে নিয়ে যখন সহাস্যে কথা বলছিলেন অনেকটা কনফিডেন্টের সাথে, তার বাহ্যিক পরিপাট্যে ছিল সুরুচির পরিচয়।যিনি কথায় কথায় মহিলা কলিগের প্রায়োরিটি ও প্রশংসা সমানতালে করে যাচ্ছেন, একবার কি ভেবেছেন তার চাকরিজীবি স্ত্রী ও কি পরিপাটি ভাবে পৌছুতে পেরেছে কি না।
কিংবা কোনো ছুটির সকালে বলা হয়েছিল কি, আরেকটু ঘুমাও, প্রতিদিনের মতো বাসায় না খেয়ে একটু বাইরে বেরিয়ে আসবো বাচ্চাদের নিয়ে।
সকাল হলেই ম্যাসেঞ্জারে টুংটাং শব্দে গুডমর্নিং, সুপ্রভাত বন্ধু ইত্যাদির হিড়িক ছোটে।
সেই বন্ধুরাই কি তাদের ওয়াইফ দের চায়ের কাপ এগিয়ে দেওয়ার সময় হাতটা ধরে পাশে বসায়,জিজ্ঞেস করে রাতে তোমার কেমন ঘুম হলো? খুব জানতে ইচ্ছে করে!
কাজের ফাঁকে ও বন্ধু আড্ডার মধ্য মনি হয়ে অনেকটা সময় কাটিয়ে যে বাবাটি বাসায় ফিরে, তার ছোট ছোট দুই সন্তানের মা সারাদিন একলা বাচ্চা দুটিকে নিয়ে যে ছোটাছুটির মধ্যে দিন পার করে, আবার স্বামী সেবায় ও ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তার মাথায় হাত দিয়ে কি একবার ও জিজ্ঞেস করা হয়,কেমন ছিলে সারাদিন?
কোন খাবারে লবণ কম,চায়ের লিকারটা আরেকটু কড়া হলে ভালো হতো কিংবা অমুক ভাবীর হাতের রান্নাটা কিন্তু বেশ ছিল…
এরকম ডায়ালগ গুলোর মধ্যে কি এক আদিম আভিজাত্য কাজ করে , এরকম মানসিকতা থেকে কয়জন পুরুষ বের হয়ে আসতে পেরেছে!
নিজের ব্যক্তিত্বকে শক্ত পোক্ত করতে গিয়ে সাথের মানুষটির কথায়, কাজে ত্রুটি খুঁজে বেড়ানোর মধ্যে ও আদিম উন্মাদনা।
অবাক হই,হতাশ হই যখন ভাবি একটা নারী মানসিক ভাবে কতটা শক্ত হলেই পারে দিন রাতের কত কত কাজের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করতে!
দিন শেষে কিছু অতর্কিত কথায় চোখ ঝাপসা হয়,সেই ঝাপসা চোখে ও আল্পনার রঙ ছুঁড়ে দেয়া নারী পরের দিনের জন্য আবার প্রস্তুত করে শরীর ও মনকে।
আমার দেখা, একজন উর্ধতন কর্মকর্তাকে বলতে শুনেছিলাম,
“আমার বাবাকে দেখেছি রাগ উঠলে
তিনি খাবার ভরা প্লেট ছুঁড়ে ফেলতেন,আমার মা যার আটটি সন্তান জন্মদানের কারণে শরীর প্রায় হাড্ডিসার, সেই শরীর নিয়ে ও তিনি সেই খাবার সহ প্লেটটি নিশ্চুপ হয়ে তুলে নিতেন। এই জন্য আমি কোনো দিন এরকম কাজ করিনি যেটা আমার মায়ের কিংবা আমার ওয়াইফের কষ্ট হয়।”
ওই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথাটি শুনেছিলাম।
এরকম ও দেখেছি, একটা সন্তান দেখেছে বাবা তার মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটাই তার ওয়াইফের সাথে করার চেষ্টা করছে।
আমার ছেলে এবারের এস এস সি পরীক্ষার্থী, মেয়ে ক্লাস টেইনে পড়ে।
আমি আমার কাজে সাহায্য করার জন্য ছেলেকেই বলি এবং এও খেয়াল করেছি অনেক আগ্রহ নিয়েই কাজটা করে দেয়।
এতে আমাকে যে যাই ভাবার ভাবুক, আমার ভাবনায় শুধু থেকে যায় নারীকে সম্মান করো,কাজের মর্যাদা দাও, দিন শেষে এটা বলো না সারাদিন ঘরে থেকে কি কর,তোমার কাজটাই বা কি ?
বছরের ৩৬৫ দিনে কি নারীটি চার দিনের জন্য ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়না,হতাশায় ডুবে যাওয়া কিংবা বিনোদনের শূন্য কোঠায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে হাঁপিয়ে ওঠে না?
পাশে থাকা মানুষটি ভালোবাসার হাতটি বাড়িয়ে দিলে ছিটকে পরা পারদের মতো দেহ মন এক হয়ে,
দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে আবার তার চিরায়ত ঘরদোর সংসার, সমাজ সাজানোর মতো শ্রমে মিলিয়ে দেয় পরম মমতায়।
লেখক–  জেসমীন আক্তার