Home আন্তর্জাতিক বিদায়ী ইউনুস সরকারের মার্কিন চুক্তি: এটি কি বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘গোলামী দলিল’?

বিদায়ী ইউনুস সরকারের মার্কিন চুক্তি: এটি কি বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘গোলামী দলিল’?

150
0
ইউনুস সরকারের মার্কিন চুক্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৫ সালের শেষভাগ এবং ২০২৬-এর শুরুটা অত্যন্ত নাটকীয়। বিদায়ী ডক্টর ইউনুস সরকার ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক তিন দিন আগে, ৯ই ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ—সবার মনে একটিই প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি স্বেচ্ছায় তার সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজু নুরুল এই চুক্তিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের “সবচেয়ে বড় গোলামী চুক্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আসুন জেনে নিই এই চুক্তির গভীর ধারা এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

চুক্তির মূল ধারা ও উদ্বেগের কারণ

  • তড়িঘড়ি ও চরম গোপনীয়তা: জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে কেন এত তড়িঘড়ি করে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সই হলো, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
  • আমদানি শুল্কের ধস: চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যের (ওষুধ, কৃষি পণ্য, মাংস, চিজ ইত্যাদি) ওপর বাংলাদেশকে শুল্ক কমিয়ে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।
  • মান নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানো: বিএসটিআই (BSTI) বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে মার্কিন পণ্যের মান বা রাসায়নিক নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। এমনকি GMO (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) পণ্যও কোনো পরীক্ষা ছাড়া দেশে প্রবেশ করতে পারবে।
  • খনিজ সম্পদের অধিকার: চুক্তির ৫.১ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি অংশ নিতে পারবে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
  • পররাষ্ট্রনীতিতে পরাধীনতা: আমেরিকা যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তবে বাংলাদেশকেও তা মেনে চলতে হবে। এটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দেবে।

চুক্তির ভালো ও খারাপ দিক: একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টি

যেকোনো চুক্তিরই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ থাকে। নিচে এর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

ইতিবাচক দিক (Potential Benefits):

  1. পণ্যমূল্য হ্রাস: শুল্ক কমলে উন্নত মানের মার্কিন পণ্য ও প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে আরও সস্তায় পৌঁছাতে পারে।
  2. সরাসরি বিনিয়োগ (FDI): খনিজ সম্পদ ও আইটি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়লে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
  3. কৌশলগত সম্পর্ক: ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী ঘনিষ্ঠতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়াতে পারে।

নেতিবাচক দিক (Major Concerns):

  1. সার্বভৌমত্ব বিসর্জন: দেশীয় মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদাহানিকর।
  2. দেশীয় শিল্প ধ্বংস: মার্কিন পণ্যের অসম প্রতিযোগিতায় স্থানীয় কৃষক, ওষুধ কোম্পানি ও দুগ্ধ খামারিরা ধ্বংসের মুখে পড়বে।
  3. রাজস্ব ক্ষতি: হাজার হাজার পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করলে সরকারি কোষাগারে বিশাল ঘাটতি দেখা দেবে।
  4. নিরাপত্তা ঝুঁকি: ডিজিটাল ডাটা লোকালাইজেশন করতে না পারা এবং মার্কিন সাইবার নীতির সাথে তাল মেলানো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লাই বেশি ভারী। গার্মেন্টস খাতের কাঁচামাল হিসেবে ব্যয়বহুল মার্কিন তুলা কেনা থেকে শুরু করে ওষুধ শিল্পের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে। নতুন সরকারের জন্য এই “গেরাকল” থেকে বের হওয়া হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।