পুকুরটা ফুলেফেঁপে যৌবনমতী হচ্ছে,পানিগুলো ঘাটের সিঁড়ি ডুবিয়ে উপরি অংশ ছুঁইছুঁই সহ সব তীর ছাপিয়ে যাচ্ছে।
পুকুর লাগোয়া ইটের রাস্তাটি যে বাঁধ সেধে বসে আছে বুড়িগঙ্গা নদীটিকে অপর দিকে রেখে।
দুর্বার নদী বাঁধ ভাঙলো এবার,
হুড়মুড় করে রাস্তা ছাপিয়ে সমস্ত যৌবন জোয়ার নিয়ে আছড়ে পরল পুকুরের গায়ে।
নব যৌবনা পুকুর খলবলিয়ে উঠলো খুশিতে, ঘষা কাচ রঙা পানির রঙ হয়ে উঠলো স্বচ্ছ,সাদা।
মিলন গৌরবের আনন্দে নিজের স্ফীতি বাড়িয়ে ঘাট সহ এ বাড়ি ও বাড়ির সরু গলি গুলোতে ও নিজেকে উপচে ধরলো।
পুকুর নদীর এই আনন্দে আমরাও আনন্দে মাতোয়ারা।
সিঁড়ি দেওয়া ঘাটটি যখন পানির তলায় নিমজ্জিত, তখনও ঘাটের দু পাশে ইট রঙা প্রাচীর দুটো সগৌরবে দাঁড়িয়ে।
ছোট্ট আমি সহ পাড়ার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দুপুর হওয়ার আগেই সেই প্রাচীরে উঠে পুকুরের পানিতে লাফ দেওয়ার খেলা খেলতাম, কখনো নিজের পরনের ফ্রক দিয়ে পানিতে বসে বেলুন বানাতাম, কখনো বা সিলভার এর মাঝারি আকারের কলস নিয়ে সাঁতার কাটতাম।
কেউ আবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে কতক্ষণ পানির নিচে থাকতে পারে,আবার পানির নিচে থেকে তিমি মাছের মতো লাফিয়ে উঠার খেলা খেলতো।
আনন্দটা আমার বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না।
যেই না খেলা জমে উঠতো, চোখের পাপড়ি ভর্তি পানিতে ঠিক মতো তাকাতে পারছি না,দূরে দাঁড়ানো মায়ের অবয়বটি ঠিকই দেখতাম।
খেলা ছেড়ে উঠতে কতো যে কষ্ট হতো তা ভাষায় কি করে বলি!
শুধু মনে মনে ভাবতাম রুপকথার গল্পের দৈত্যটা কি আমার মা টা কে দু এক ঘন্টার জন্য কোনো দ্বীপে বন্দী করে রাখতে পারে না!
মনের ভাবনায় এও আসতো, যদি আমার কাছে রুপোর কাঠি সোনার কাঠি থাকতো, তাহলে গল্পের রানীর মতো আমার মাকে রুপোর কাঠি দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে আমার সারাদিনের দুর্বার কর্মযজ্ঞ শেষ করে সোনার কাঠি দিয়ে মায়ের ঘুম ভাঙাতাম।
ভাগ্যিস আমার মেয়ের মাথায় রুপকথার গল্প নেই,তাহলে সে ও হয়তো তাই ভাবতো!
পুকুরের পানি যখন অলি গলি ছাড়িয়ে এর ওর বাড়ির দরজা পর্যন্ত, আমরা ছোটোরা তখন বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত।
জায়গায় জায়গায় কাঠি গেড়ে পানির উচ্চতা দেখা, কার বাড়ি পর্যন্ত পানি গেল, সে খবর মায়ের কাছে পৌছানো, খামোখাই পানিতে হাঁটা,মাঝে মাঝে ছোট মাছ দেখে লাফিয়ে উঠার সাথে মাছ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করা।
শুধু কি এই! এলাকার বড়দের কর্মকাণ্ড দেখে অবাক বিস্ময় প্রকাশ করাও ছিল আরেক কাজ।
কেউ লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত তুলে বড় বড় মাছ ধরে যাচ্ছে,কেউবা আসন্ন বিপদেরগন্ধ পেয়ে ঘর লাগোয়া বাঁশের মাচা তৈরি করছে, কিশোর শ্রেণি গুলো এখানে ওখানে বঁড়শি পেতে নিশ্চুপ বসে থাকে,কেউ সেখানে গেলে তাকে ও মুখে আঙুল দিয়ে ইশারা করে চুপ করিয়ে দেয়।
মাঝে মাঝে মা বলতেন, “তোরা তো এখন বেহেশতে আছস,বালিশে মাথা দিলেই ঘুম।”
এরকমই সারাদিনের দৌড় ঝাপে নেতিয়ে পরা শরীরটা এক রাতে বিছানায় দেওয়ার সাথে সাথেই প্রায় সকাল হয়ে গেল।
ঘর থেকে বের হলেই এক অজানা আনন্দ উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠলাম।
তখন আমাদের কাঠের ফ্রেম সহ চৌচালা দুইটা ঘরের মেঝে মাটির হলেও বারান্দাসহ রান্নাঘর, বাথরুম ছিল পাকা।
বাথরুম সহ নিচের বারান্দা গতকাল বিকেলেই দেখেছি পানিতে ডুবেছে,সেখানে অবাধ মাছের পোনার সাঁতার দেখে অনেক উচ্ছ্বাস নিয়ে রাতে ঘুমিয়েছিলাম।
সকালে দেখি উপরের বড় বারান্দা সহ রান্না ঘরে পোনা মাছের আনাগোনা।
আমার মা বারান্দায় লাগানো টেবিলে বসে গালে হাত,আমার কেন যেন খুব খুশি লাগছিলো, যেন এই দিনটিরই অপেক্ষায় ছিলাম।
সবার বাড়িতে আরও আগেই পানি ঢুকেছে, এই কষ্ট ও ছিল মনে।
হঠাৎ ই দেখি তড়িঘড়ি করে সবাই ঘরের জিনিস পত্র গুছিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখছে।
ঘন্টা দুয়েক পরেই দেখি আমার মামা নৌকা সহ আমাদের বাড়ির গেটে।
যতটুকু পারা যায় গুছিয়ে আমরা সবাই নৌকায় গিয়ে বসলাম।
ঘোর তো কাটছেই না,যেখানে অনেক খানি রাস্তা হেঁটে নদীর ঘাটে এসে নৌকায় উঠতাম,আজ বাড়ির গেট থেকে।
আসার পথে খেলার সাথীদের চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, সবাইকে পেলাম না।
কেন যেন সবাই কে রেখে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।
এও দেখলাম পুকুর, নদী, মানুষের ঘর সবই একইভাবে ভাসছে।
অনেককে ঘরের চালের উপর ও দেখলাম।
সেইসময় নানী আমাদের বাসায় ছিলেন, মাঝ নদীতে যখন আবিষ্কার করা হলো আমার নানী তাড়াহুড়ো করে বোরকা পরায় উপরের অংশটুকুই পরেছে,নিচের অংশ টুকু নেই দেখে বিশাল এক অপরাধ বোধে তাঁর চেহারাটা যা হয়েছিলো না,সে আর বলতে!
মামাবাড়ি এসে দেখি সেখানে এক এলাহি আয়োজন।
আমরা আসার আগে আমাদেরই আত্মীয় আরও পাঁচ ছয় জন সেখানে উপস্থিত।
এলিফ্যান্ট রোডের ভুতের গলির সেই তিন বেডসহ ড্রইং কাম ডাইনিং রুমের বাসায় প্রায় সতের আঠারো জন কিভাবে ছিলাম সে আরেক বিষ্ময়!
ওই যে বলেনা! যদি হয় সুজন তেতুল পাতায় নয়জন।
আসলেই তাই!
প্রায় ১৫_২০ দিন কতটা আনন্দের সাথে আমরা দিনগুলো কাটিয়ে ছিলাম। আনন্দ আন্তরিকতার কমতি ছিলো না কোনো।
মোজাইক করা মেঝেটিতে মামা তার ভাগ্নেদের নিয়ে লাঠি দিয়ে বল একটি নির্দিষ্ট ঘরে ফেলার খেলা খেলতেন,আমরা ছোটোরা কখনো লুডু কখনো ক্যারম খেলতাম। কেউ কখনো দাবা নিয়ে ও বসেছে।
আর ফাঁকে ফাঁকে টিভিতে চোখ দিচ্ছিলাম, আমাদের এলাকা দেখা যায় কি-না এই ভেবে।
টিভির পর্দায় বার বার এরশাদ সাহেবের ত্রান সামগ্রী দেওয়ার দৃশ্যটি খুব অভিভূত হয়ে দেখতাম আর গাওয়া গানটি প্রায় মুখস্ত করে ফেলছিলাম, কি যে সুমধুর লাগতো গানটি!
তোমাদের মাঝে এসে বিপদের সাথী হতে….
সকাল হলেই মামীর হাতের গরম পরোটা, এরই ফাঁকে মুড়ি চানাচুর, আরও নানা কিছু চলতেই থাকত।
সময় গড়িয়ে এলো, আমাদের ও ফিরে আসার পালা…
কে কার সাথে ঘুমাবো,কে কোন গল্প বলবে ইত্যাদি নিয়ে কাজিনদের সাথে খুব সুন্দর সময় কেটেছে, ছেড়ে আসতে খারাপ লাগলেও কিছুই করার ছিলো না।
মাঝ নদীতে এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখি তীর ঘেষা বাঁশ বেড়ার ঘরগুলো আর নেই।
নদীর ঘাটের সিঁড়ি থেকে পলিমাটি গুলো তখনও সরেনি।নৌকা থামল ঘাটে,পাশেই কাক ভর্তি জায়গায়টায় ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম গরু মরা।
কাকগুলো সব একসাথে এমনভাবে জটলা করে আছে যে দুই একটা চিল ছোঁ মেরে নিচের দিকে এসে আবার চলে যাচ্ছে।
একটু দূরে চোখ পরতেই দেখি একটা কুকুর মরে আছে,সেখানে ও কাকের ভীড়।
বিষন্ন মনে নদীর কিনারায় কেউ কেউ এটা ওটা ধুচ্ছে।
কিছু ছোট ছেলে পানিতে লাফাচ্ছে।
হাঁটার সময় খেয়াল করলাম ইটের রাস্তাটা তখনও কাদা জমে গেরুয়া হয়ে আছে।
যে উঠোনটিতে আমরা সবাই খেলা করতাম, সেখানে আমাদের কুতকুত খেলার দাগকাটা ঘরগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে,কেউ চীনা মাটিতে পিছলে যাওয়ার পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে।
এদিক সেদিক তাকিয়ে সবাই কে দেখার চেষ্টা করলে ও, পা টিপে টিপে হাঁটছি, পাছে পা পিছলে পরে না যাই এই ভয়ে।
দু একজনের সাথে দেখা হলো কিন্তু ভালো মতো কথা বললো না,একটু মন খারাপ হলো।
বাড়ির দরজার তালা খোলা হলো,বারান্দা দুটোতে মাটির আস্তরের উপরে কেঁচোর অবাধ হাঁটাচলা স্পষ্ট।
মাটির চুলোর টিকলি গুলো হা হয়ে আছে,চুলোর ভেতর তখনও কিছু পানি জমে ছিল।
ঘরের দরজার তালা খুলে মায়ের গলার হায় হায় ধ্বনি কানে আসলো, খাটের জাজিম গুলো খাটের উপর টেবিল দিয়ে উঁচু করে তুলে রাখা হয়েছিল, দুইটির মধ্যে একটি ভিজে শেষ!
চালের ড্রাম ভর্তি পানি,চাল গুলো ফুলে চিড়ার মতো হয়ে আছে।
যেহেতু ঘরের মেঝে মাটির, পা টিপে টিপে হাঁটতে হচ্ছে।
জুতোর বাক্সের মধ্যে আমার কিছু পাথর, তেতুল বীচি,পুতুলের কাপড়ের কিছু সংগ্রহ, দুই চারটা হাতে বানানো ঈদকার্ড, কাজিনদের কাছ থেকে পাওয়া কিছু চিঠি ভিজে একাকার। কেন যেন কষ্ট হলোনা!
চারদিকে এতো ধ্বংস যজ্ঞ,আমার আর তেমন কি ক্ষতি!
আসবাবপত্র গুলো প্রায় অর্ধেকটাই সাদা হয়ে আছে,যতটুকু পানি উঠেছিল তার চিহ্ন স্পষ্ট।
থেকে থেকে মায়ের হায় হায় ধ্বনি কানে আসছে।
সেদিকে খেয়াল না দিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে পরলাম…
খেলার সাথীরা টিপ্পনী কাটতে ভুল করলো না,
বলে গেল…
“তোরা তো চইলা গেলি, আমরা সবাই অনেক মজা করছি,প্রায় সারাদিনই ঘরের একচালা থেকে আরেক চালায় গেছি,ওখানেই আচার, মুড়িমাখা খাইছি, বড় ভাইয়েরা মাছ ধরছে আমরা দেখছি।”
কেউ একজন চাল গড়িয়ে পানিতে পরে গেছে সে কথা ও জানলাম, বৃষ্টিতে ভিজে আবার রোদে শুকিয়েছে,রাতে পালা মুরগী গুলোর সাথে টিনের চালের নিচের অংশে যে বাঁশের চাটাই দেয়া আরেকটি অংশ থাকে সেখানে অনেকে ঘুমিয়েছে।
গ্রামের দুই টা বাচ্চাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, একজন বৃদ্ধ ও মারা গেছেন, অনেকের রান্না করার কোনো জায়গা কিংবা উপকরণ ছিলো না বলে অনেক দিন চুলা জ্বলেনি,শুকনো চিরে মুড়ি খেয়ে ছিল অনেকেই।
কেউ রেডিও নিয়ে সারাদিনই খবর শুনে গেছে,কারো বাসার টিভি খুলে দেখেছে এরশাদ সাহেবের ত্রান দেওয়ার মুহুর্ত, আশায় ও থেকেছে অনেকে আসবে হয়তো এমন দূত তাদেরও দরজায়,আসেনি।
শেষ দিকে নাকি বিদ্যুৎ সংযোগ ও ছিলো না,তখন অনেক কষ্ট হয়েছে সবার।
নীচে পানি উপরে অন্ধকার, আকাশের চাঁদই একমাত্র সম্বল।
মনটা কেমন করে উঠলো, খুব আফসোস হলো থাকতে পারিনি বলে।
পুকুরের দিকে চোখ পরতেই দেখলাম, জোয়ারের টানেযেভাবে আনন্দ উল্লাসে নিজেকে মেলে ধরেছিল, ভাটার টানে সেভাবেই চুপসে গেছে।
বাঁধভাঙা স্বাধীনতার ফলে আব্রু সমেত কচুরিপানা গুলো এখানে সেখানে ছড়িয়ে পুকুরটা প্রায় নগ্ন হয়ে আছে।কিছু কচুরিপানার মুঠি ধরে এক জায়গায় জমা করে গ্রামের দামাল ছেলেরা টিবি বানিয়ে এবাড়ি ও বাড়ি পাড় হওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে, এটা ও যেন পুকুরের অবাধ্যতার শাস্তি!
নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে পুকুর টি যেন নিস্তেজ, নিস্তব্ধ,বিষন্ন হয়ে খোলা আকাশের নিচে নিথর পরে আছে।
লেখক- জেসমীন আক্তার








