Home জুলাই জাগরণ শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় ১৭ নভেম্বর

শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় ১৭ নভেম্বর

জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধ

332
0
শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার প্লট বরাদ্দে জালিয়াতি

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন শীর্ষ আসামির বিরুদ্ধে আগামী সোমবার (১৭ নভেম্বর) রায় ঘোষণা করা হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর), শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির রায়ের এই দিন ধার্য করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার অপর দুই গুরুত্বপূর্ণ আসামি হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন

মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক

এর আগে, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে, এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি আল-মামুনের ভাগ্য আদালতই নির্ধারণ করবেন।

মিজানুল ইসলাম অভিযোগ করেন যে, আওয়ামী লীগ দেশের ভেতরে ও বাইরে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করার জন্য নানামুখী অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। তবে, তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, “বিচার তার নিজস্ব গতিতে চলবে। স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিচার কার্যক্রম চলছে এবং ট্রাইব্যুনাল কারও মাধ্যমে প্রভাবিত হবে না।”

মামলার পটভূমি ও ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) দায়ের করা হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কাজ শুরু হয় এবং সেদিনই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। প্রথম দিকে কেবল শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি থাকলেও, চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রসিকিউশনের আবেদনে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও এই মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ গঠন, রাজসাক্ষী ও যুক্তিতর্কের সমাপ্তি

গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রসিকিউশন মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ১২ মে প্রায় ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে তথ্যসূত্র, দালিলিক প্রমাণাদি এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ রয়েছে। এর ভিত্তিতে ১ জুন ট্রাইব্যুনালে হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও আল-মামুনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ওই দিনই অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।

১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার একপর্যায়ে, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটনে (অ্যাপ্রুভার) রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন, যা ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।

গত ২৩ অক্টোবর মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উভয়ই শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন তাদের খালাস প্রার্থনা করেন। এরপরই ট্রাইব্যুনাল ১৩ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণের ঘোষণা দেন।

পাঁচটি মূল অভিযোগ

মামলায় প্রসিকিউশনের আনিত পাঁচটি প্রধান অভিযোগ নিম্নরূপ:

  1. প্রথম অভিযোগ (হত্যা ও উস্কানি): গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের “রাজাকারের বাচ্চা” ও “রাজাকারের নাতিপুতি” বলে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য। এই উস্কানির জেরেই আসাদুজ্জামান খান, আল-মামুনসহ তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে। এর ফলে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং প্রায় ২৫ হাজার আহত হন।
  2. দ্বিতীয় অভিযোগ (মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ): হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার জন্য শেখ হাসিনার নির্দেশ। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীর মাধ্যমে সেই নির্দেশ কার্যকর করেন।
  3. সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (সর্বোচ্চ দায়): দ্বিতীয় অভিযোগের আলোকে, এই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনকে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (সর্বোচ্চ দায়) আওতায় অভিযুক্ত করা হয়।
  4. তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ (সুনির্দিষ্ট হত্যা): রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা এবং রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
  5. পঞ্চম অভিযোগ (পুড়িয়ে হত্যা): আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায়ও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুন অভিযুক্ত হয়েছেন।

তথ্য সূত্র- ইত্তেফাক