টলে যাওয়া পা দুটো সান্ধ্যকালীন আবছা অন্ধকারে খুব সন্তর্পণে ফেলার চেষ্টা করে ও শেষ রক্ষে করতে পারলো না হাতে ধরে রাখা পলিব্যাগের সবজি ভর্তি বাজারের।

অদুরে পাঁচিলের মধ্যে কয়েক জন বন্ধু নিয়ে বসে থাকা কিশোর নিঃশব্দে গল্প ছেড়ে উঠে এসে পরে যাওয়া সবজি গুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে খুবই মনোযোগ সহকারে।

বাবার জড়ানো কণ্ঠের বলে যাওয়া প্রলাপ কানে না তুলেই কিশোর ব্যাগ হাতে বাড়ি পথে রওনা হলো।
কোনো এক সান্ধ্য রাতে স্যান্ডেল ছাড়া ভেজা কাপড়ে দেখে কিশোরের মা আঁতকে উঠেছিলেন।
সদ্য চাকরিতে যাওয়ার একমাস পূর্ণ হওয়ায় মাসের বেতন পাওয়ায় অনেকটা আনন্দচিত্তে দুই বন্ধু নৌকাযোগে বাড়ি ফিরছিলো, পথিমধ্যে ছিনতাইকারীর দল আরেক নৌকা নিয়ে হামলা করে।
সংঘর্ষের ফলে নৌকা উল্টে যায়।

ধরে রাখা ছাতা এবং স্যান্ডেল খোয়া গেলে ও মুষ্টি বদ্ধ হাতে রাখা তিনশো টাকা মায়ের হাতে দিয়ে বলে ” মা, আমার প্রথম বেতন হারাইতে দেইনি।তুমি শুধু আমারে বাবার কাছে যাইতে কইওনা।”
মায়ের চোখে সেইদিন ঝরঝর করে
ঝরেছিল অশ্রু।

কিইবা বয়স ছেলের! ছোট আরও সন্তান থাকায় সংসার চালাতে হিমসিম খাওয়া মা ছেলের এই উপার্জন টুকু শুকনো মরুভূমির বুকে বৃষ্টির মতো মনে করে। যদি ও বুকের ভেতরটা খচখচ করে অল্প বয়সে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়।
হ্যাঁ, কিশোর অল্প বয়সেই শিখে গিয়েছিল গুছিয়ে বাজার করা,পুরোপুরি হাল না ধরতে পারলেও বেশখানিকটা ধরেছিল।
পাশের বাড়ির কারো কাছে একটা কাচা মরিচের জন্য ও যেন যাওয়া না লাগে তার মায়ের সেইদিকটা খুব ভালো ভাবে খেয়াল রেখেছিল।

একবার কয়েক জন বন্ধু মিলে গ্রামের এক বন্ধুর মায়ের হাতের হাঁসের মাংস ও চালের আটার রুটি খাবে বলে চাঁদা তুলে ছিল।
রান্না শেষের এক পর্যায়ে সে লজ্জাকে উপেক্ষা করে বলে ফেলেছিল,
“আমার ভাগের টা আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিস।”
এরকম অনেক ভাবেই জলাঞ্জলি দিয়েছিল তার একান্তই নিজস্ব আনন্দটুকু।জেসমীন আক্তার-লেখক

কিশোর আস্তে আস্তে পূর্ণ উদ্যোমী সুদর্শন যুবকে পরিনত হয়।পারিবারিক স্বচ্ছলতা ও বাড়ে। রান্না ঘরে মায়ের গুনগুনানীই বলে দেয় তাঁর ভালো থাকার কথা। যুবক কৃতজ্ঞচিত্তে নিজেকে সুখী ভাবতে শুরু করলে ও প্রাণ খুলে হাসতে কোথায় যেন বাঁধে।
সবাই যে বয়সে প্রেম পত্র চালাচালিতে ব্যস্ত, সেসময় যুবক ক্যারম,কার্ড খেলায় টাইমপাস করে।
মদ্যপান , নারী আসক্তি, নোংরা গালাগাল এই তিনটি বিষয়ে নিজেকে একেবারেই সড়িয়ে রেখে ছিল।
আচার ব্যবহারে ও অনেকের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছিল।

গ্রামের মানুষের মধ্যে ও জয়ধ্বনি, বাবার শাসন ছাড়া ও এমন সোনার ছেলে কিভাবে হয়?
কৈশোরের সরল দুষ্টুমি করার সময় যাকে চিন্তা করতে হয়েছিল কে কিভাবে নেবে।
যৌবনের সহজাত স্বভাবের ক্ষেত্রে ও শামুকের মতো গুটিয়ে নিয়েছে, খোলসের ভেতর থেকে কিভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, তা তার অজানা নয়।

পরিবারের ছোটদের কমবেশি আহ্লাদী আবদার পূরণ না করলে ও অবশ্য প্রয়োজনীয় কর্তব্য গুলো করে গেছে।
হ্যাঁ তমিজ,
কিশোর বয়সে হাফপ্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে হাঁটার সময় লুঙ্গির একপাশ হাতের আঙুলে সামান্য উঁচু করে হাঁটতো বলে নানী ডাকত তমিজ বেপারি।
ভালোই লাগতো তমিজের,
নানী যে ওর খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন।

পূর্ণ বয়স্ক তমিজ আজ বড় বেসামাল। এক সন্তানের বাবা সে,চপলা স্ত্রীর সাথে প্রায়শই অন্তর্দন্দ্ব হয়ে যায়।
স্ত্রীর চোখের রঙ মাখানো স্বপ্ন, ধীর স্থির তমিজের সবসময় বোধগম্য হয়ে ওঠে না।
দিনের পরিক্রমায় মায়ের হাতের সংসার স্থানান্তরিত হয়,
অফুরন্ত অবসরপ্রাপ্ত মা পূর্ব থেকেই মায়ের সাথে কম বলা তমিজ, যা মা নতুন করে উপলব্ধি করে নিজেকে দুঃখী ভাবতে শুরু করে। কর্তৃত্বের অভাবে গুরুত্ব হীন ও মনে হয় মাঝে মাঝে।

যে চারদেয়ালে সবসময় তাঁরই হাঁকডাক এবং তাঁর ছেলেমেয়ের কোলাহল প্রতিধ্বনিত হতো,সেখানে চঞ্চলা বধুর খিলখিল হাসি,উচ্চস্বরে কথা বলা বড়ই বেসুরো, বেঢক ঠেকে মায়ের কাছে।

নিঃশব্দ সকালে ছেলের বউর করে যাওয়া কাজের থালা বাসনের ঝনঝনাঝন শব্দ কানে বাজে।
ছেলের বউয়ের আধুনিক কথার ঘোরপ্যাঁচে তাঁর বয়সজনিত বোকা কথায় জড়িয়ে শুরু হয়ে যায় কলহ।
অভিযোগ, অনুযোগ তিক্ততা বাড়তে থাকে।
পাড়া পড়শী গুনগুনায়,আত্মীয় স্বজন মিটিং বসায়।
অসহায় বোধ করে ভীষণ!কখনো স্ত্রী কে কখনো মা কে বোঝায় তমিজ।

স্ত্রীর অতিরঞ্জিত ব্যবহারে
মায়ের চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করে মাকে অনেকটা কচ্ছপের মতো গুটিয়ে থাকার ও কথা বলে।
উঠতি বয়সী সন্তানের আদর্শ বাবা হওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় তমিজ।
ভালো বাবা কিংবা ভালো স্বামীর কোনো চিত্রপট তমিজের চোখ শতচেষ্টা করে ও আঁকতে পারেনা, তবুও চোখ বন্ধ করে আঁধারে হাতরায়।

অলস অবসন্নতায় যখন চোখের পাতায় ঘুম থাকেনা, তখন একে একে মনে করে স্বামী বিচ্ছেদী জীবনের ঘাত প্রতিঘাতের কথা, অন্যান্য সন্তানদের অপরিনামদর্শীতা কিংবা দুঃখের কথা।
কতশত চিন্তায় তমিজের মায়ের রাত হয় ভোর।

কাজে যাওয়ার সময় তমিজ মায়ের নির্ঘুম লাল চোখ দু’টো দেখে অনেকটা মন খারাপ নিয়েই বেরিয়ে পরে।
অবুঝ মা যদি একবার ছেলেকে ডেকে বলতো বাবা আমি ভালো আছি।কিন্তু তা আর বলা হয়ে ওঠে না।
কিশোরের উচ্ছ্বলতা, তরুনের চঞ্চলতা, যৌবনের রোমাঞ্চতা কোনো কিছুই ভালো ভাবে উপলব্ধি না করা তমিজ শুধু মায়ের হাস্যমুখ দেখার স্বপ্ন দেখেছিল।

বয়স জনিত মায়ের হাড়ভাঙা মুখ ওর ভেতরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।আর ভাবে, এই দায় কি ওর একার ছিল? নিজেকে ও শুধায় আর কতখানি ভালো হলে তার মা আরেটু ভালো থাকতে পারতো কিংবা থাকবে।
তমিজের পাঁজর ভাঙা নিঃশব্দ আত্ম চিৎকার চারদেয়ালের বন্দি বাতাস টুকুই শুধু ভারী করে।

“লেখক- জেসমীন আক্তার”