ঘরে ঢুকতেই অনেকটা ইঁদুর মরে পঁচে যাওয়ার মতো উৎকট গন্ধটা সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিল।
ছোট্ট একটা খাটে প্রায় রক্তশূন্যতায় পাংশুটে হয়ে যাওয়া চেহারায় কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালেন প্রৌঢ়।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির স্বামী একটু এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,কেমন আছেন?
অতি খুশি এবং কান্নার মাঝামাঝি অনুভূতির সংমিশ্রণে মুখ থেকে বের হয়ে এলো, “ভালো আছি বাবা।”
এবং ইশারায় খাটে বসার ইঙ্গিত করলেন।
মেয়েটি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, শুধু অনুসন্ধিৎসু চোখ দুটো সামনে বসে থাকা প্রৌঢ়ের পায়ের ব্যান্ডেজ করা বুড়ো আঙুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পরিপাটি ঘরটির চারপাশ ও একনজর দেখে নিল।
অস্বস্তি বেড়েই চলল,উৎকট গন্ধটার কারণে।
পরিস্থিতির মোড় ঘুরলো, দরজায় উঁকি দিয়ে এক মহিলা প্রৌঢ়কে প্রশ্ন করলেন,” এরা কারা ভাই?”
আবেগ আপ্লুত খুশি ভরা কণ্ঠে প্রৌঢ় উত্তর দিলেন, “এটা আমার মেয়ে ও মেয়ের জামাই। ”
কথাটি শুনে মহিলাটি সাথে সাথে জিভে কামড় দিলেন।
এক পা দুই পা করে মহিলাটি ঘরে ঢুকতেই প্রৌঢ় পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি পাশের বাড়িতেই থাকেন।
অবাক হওয়া মহিলার ঘোর কাটেনি তখনও, এক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়েই আছেন।
পিনপতন নীরবতা ভেঙে মহিলাই প্রথম কথা বললেন, ” যার এরকম মেয়ে, মেয়ে জামাই আছে সেই মানুষটা এইখানে এইভাবে কষ্ট করে!
আমরা সারারাত ঘুমাইতে পারিনা তার চিৎকারে, পায়ের আঙুলে অনেক দিন ধইরা ঘা,ব্যাথায় রাতে ঘুমাইতে পারে না।
দুই দিন আগে পাশের বাড়ির এক লোক কিসব পাতা লতা দিয়ে প্যাচায়া রাখায় দুই ঘন্টা পর একটা জেতা পোকা আঙুল থেইক্কা বের হইছে,” বলে মহিলা একটু থামলেন।
“এই যে ঘরে যে গন্ধ,এইটা আঙুলেরই গন্ধ। থাকে থাকে আর তোমগো কথা কয়,এই জন্যই তিনি নম্বর দেওয়ায় তোমারে ফোন দিসি।বাপের উপরে আর কত রাগ কইরা থাকবা?বড় ভালা মানুষ। ”
সামনে পরাজিত নতমুখী প্রৌঢ়ের, টপটপ করে গড়িয়ে পরা অশ্রুপাতের দৃশ্যটিকে ছাপিয়ে ফুটে উঠলো বহু বহু বছর আগের একটা স্মৃতিপট মেয়েটির চোখে।
প্রায় নীলচে কালো হয়ে যাওয়া গালের দাগটি লুকাতে মায়ের মাথার ঘোমটাটা একটু বেশিই বড় করে রেখেছিল সপ্তাহ খানেক। সেই কয়দিন বাড়ির বাইরে কেন, কলতলায় ও যায়নি তার মা।
দশ বারো বছরের ভীত মেয়েটি এক সন্ধ্যায় বাবা মায়ের তুমুল ঝগড়া বারান্দায় এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল,এক পর্যায়ে ঠাস ঠাস শব্দে আরো ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
অনেক বছর পর মেয়েটি বড় হওয়ার সাথে সাথে উপলব্ধি কিংবা বুঝতে পেরেছিল, এক বিধবার প্রতি আসক্তিই ছিল তার বাবা মায়ের দ্বন্ডের কারণ যার প্রতিবাদে তার মায়ের ভাগ্যে জুটেছিল বঞ্চনা।
আহা শরীর!
আহা পৌরুষের দ্বম্ভ!
ইতিমধ্যে মেয়েটির স্বামী পাশে বসে ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী কিভাবে কি করতে হবে জেনে নিচ্ছে, এবং আশ্বাস ও দিল হসপিটালে ভর্তির ব্যাপারে।
মেয়েটি ও নীরবে একটু একটু করে বাবার কাছে এগিয়ে যাচ্ছিল, ওর ভেতরে তখনও কষ্ট, মায়া কোন কিছুই কাজ করছিল না।
শুধু থেকে থেকে পায়ের আঙুলের দিকে চোখ যাচ্ছে। সেই সন্ধ্যায় যেমন বাক হীন ভীত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আজকে ও তাই হচ্ছে, মনে হচ্ছে কেউ কণ্ঠ রোধ করে রেখেছে।
মেয়েটির স্বামী কিছু একটা হাতে গুজে দিয়ে উঠে আসার সময় বলল,”আমরা আবার আসবো। “
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি চলে আসার আগ মুহূর্তে কাঁপা কাঁপা বাড়িয়ে দেয়া হাত টিকে শক্ত করে ধরে ও নির্বাক ছিল কিছুক্ষণ।
সারা রাস্তায় ও একটি কথা বলতে পারেনি, শুধু নির্ঘুম রাতে চোখ দুটোতে জমে থাকা পানির বন্যা বইয়ে গেল, যার স্বাক্ষী রয়ে গেল রাতের অন্ধকারের গহীন শব্দেরা।
এক দুপুরে মোবাইলের স্ক্রিনে অচেনা নম্বরটি ফুটে উঠলে মেয়েটি মোবাইল হাতে ঘর লাগোয়া বারান্দায় পা রাখে,অচেনা কণ্ঠস্বর…” কিছুক্ষণ আগে আপনার বাবা মারা গেছে, ” মনে হলো কানের ভেতর কেউ গরম সীসা ঢেলে দিল।
মেয়েটি পরে যায়নি, বারান্দার গ্রিলকে শক্ত করে ধরে শুধু বসে পরেছিল,কাঁদেনি তখন ও শুধু হার্টবিট এর তীব্রতার কারণে খুব খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো আর ঘটে যাওয়া কয়েকদিনের ঘটনা গুলো চোখে ভাসছিল।
সেইদিনের পরে আরও দুইবার সেই বাসায় যাওয়া হয়েছিলো এবং তাকে হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছিলো এখানে মেয়েটির ভাই ও তার আত্মীয়রা ও সহযোগিতা করেছিল।
শেষ দেখা হয়েছিলো হসপিটালের কেবিনে এক পা পুরোই কেটে ফেলার কারণে ব্যান্ডেজে মোড়ানো অর্ধ পা টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করলে নিজের মেয়েকে কাছে পাওয়ার আনন্দে নির্মল হাসিই ফুটে উঠেছিল প্রৌঢ়ের।
মেয়েটির ও ভালো লেগেছিল পা গেলে যাক,অসহনীয় ব্যাথার কষ্ট তো দূর হয়েছে। মেয়েটি কেবিনে বসে থাকা অবস্থায় তার স্বামী ভর দিয়ে হাঁটার জন্য স্ট্রেচার সহ আরও অন্যান্য ঔষধ পথ্য দিয়ে চলে আসলো।
তারপর মেয়েটির স্বামী আরো দুএক বার গেলে ও মেয়েটির আর যাওয়া হয়নি ব্যস্ততার কারণে কিংবা তেমন টান অনুভব করেনি।
গ্যাংরিন নামক অসুখের কারণে প্রথমে পায়ের আঙুল,পায়ের পাতা, পুরো পা কেটে ও শেষ রক্ষা হয়নি। পুরো শরীরেই পচন ধরে গিয়েছিল। হসপিটাল থেকে ফেরার পর অনেক কষ্টের দিনানিপাত হলে ও সাদা শুভ্র ঘুমন্ত নিথর দেহটির দিকে তাকিয়ে মেয়েটির ভেতর থেকে যে কথাটিই উঠে আসছিল বার বার…
“হে আল্লাহ দুনিয়ায় এতো কষ্ট করা মানুষটির জন্য তুমি জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিও,বেড সোর এর কারণে যে মানুষটা বিছানায় ঠিক মতো অসুস্থ অবস্থায় ঘুমাতে পারেনি তার কবরের মাটিটা শীতল করে দিও।”
না সেই দিন মেয়েটি বাসায় না ফিরে দাফন শেষে গিয়েছিল মায়ের কাছে।
নির্বিকার মা স্বামীর মৃত্যু সংবাদ তো আগেই পেয়েছেন।
দীর্ঘ বিচ্ছেদী জীবনে নিজেকে একটি শক্ত খোলশের মধ্যে ভরে রেখেছেন। ইচ্ছে করলেই কেউ তাকে পড়তে পারে না বা বুঝতে পারে না।বাইরের কঠিন অবস্থা থেকেই তাকে মূল্যায়ন করে।
সংসারী মেয়ে এখন মায়ের অনেক কিছুই বুঝতে পারে।
মেয়েকে দেখে মায়ের চোখে জমে থাকা হাজার হীরক খন্ড একসাথে চকচক করে উঠলে, মা যে সেটা লুকোনোর চেষ্টা করলেন সেটা বুঝে ও না বোঝার চেষ্টা করলো মেয়ে।
মাগরিবের আজান দেওয়ার সাথে দুইজনে নামাজে দাঁড়ালে ও সেজদায় থেকে থেকে যে মায়ের সারা শরীর কাঁপছে মেয়ে তা ঠিকই অনুভব করে, নামাজ শেষ করে অন্য রুমে চলে আসল আর ভাবলো কাঁদুক, একটু হালকা করুক নিজেকে।
হ্যাঁ, মেয়েটির নাম অরু, মায়ের কাছ থেকে ফিরে গোসল সেরে নামাযে দাঁড়িয়ে এমন ভাবে ভেঙেচুরে কেঁদেছিল,কত কান্না ওর ভেতরে জমা ছিল! বাবা না থাকলে মানুষের এমন লাগে? কিন্তু ওর তো অনেক আগে থেকেই বাবা ছিলো না।
তাহলে কি নিজেকে ব্যর্থ সন্তান হওয়ার অপরাধে নাকি মানুষের দেওয়া অপবাদে? কেন এতো কষ্ট হলো ওর? যার কারণে তিন দিনের এমন তীব্র জ্বরে একেবারে শেষ হতে হতে বেঁচে উঠেছিল সে।
অনেক বছর পর…
সোডিয়াম লাইটের নীচে ঘুমন্ত কুকুরটা কী নিশ্চন্তে ঘুমাচ্ছে,সারা রাস্তায় আলোর বন্যা থাকলেও নিস্তব্ধ, সুনসান। গাছ গুলো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে অগনিত পাতার থোকা নিয়ে, ঝিরঝিরে বাতাসে সেগুলো হালকা দুলছে সাথে সোডিয়াম আলো ও হাজার তারার আলোকে সেগুলোর সৌন্দর্য বেড়ে খেলা করছে আর যেন বলছে এই রাত আমাদের।
নির্ঘুম অরু ও প্রতিদিন হয় গাছদের এমন খেলার সঙ্গী।
যথারীতি আজও মাঝ রাতে উঠে বারান্দায় নির্দিষ্ট চেয়ারটায় বসল।
হাওয়া যেন একটু বেশিই উত্তাল হয়ে গাছের খেলা বাড়িয়ে দিল,যা অরুর শরীরে প্রশান্তি আনলো।
আকাশে লক্ষ তারার মেলা…
উন্মুক্ত আকাশে অরুর দৃষ্টি…
কী তুমি নিশ্চয়ই আকাশের ঐ উজ্জ্বল তারাটি নও? তুমি তো ব্যর্থ বাবা, তুমি কিভাবে উজ্জ্বল হবে,হয়তো আছো কোথাও আকাশের কোনো এক কোণে।
তুমি কি জানতে তোমার এই মেয়েটি নিজেকে একটু উজ্জ্বল করার জন্য আকাশ মাটিকে এক করে ফেলেছিল?
একটা আলোকিত পরিচয়ের জন্য কতটা দূর্বার হয়ে উঠেছিল?
এখন নামের আগে তোমার নাম লাগে না বাবা,কত বিশেষন মানুষ বসায়,তোমার সেই ছোট্ট বোকা মেয়েটির নামের আগে।
যে হাঁটতে গেলে পরে যেত,খেতে খেতে ঘুমিয়ে পরতো,একটু বেশিই শুকনো পাতলা ছিল বলে আশেপাশের যত ডাক্তার কবিরাজ এনে হাজির করেছিলে?
কেন বাবা তুমি সেভাবে আর ভালোবাসলে না?
তুমি কি জানতে তুমি আমাদের জীবন থেকে সরে গেলে তোমার এই মেয়েটা খেলার ফাঁকে ফাঁকে ওর ঘুমন্ত মায়ের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে দেখে যেত নিঃশ্বাস ঠিক মতো চলছে কি না, একইভাবে কখনো কখনো রাতে ও ঘুম থেকে উঠে একই কাজ করেছে।ভাবতে পারো বাবা ওই নিঃশ্বাসটুকুর মূল্য কি ছিল!
মেয়ে হওয়ায় ঘরেই বেশি থাকায়, মায়ের লুকিয়ে চুরিয়ে কান্না আমার চোখ এড়াতো না।
এমন ও হয়েছিলো তুমি চলে যাবার পর মা পুরো একমাস অসুস্থ ছিলেন, একটা পর্যায়ে মায়ের হাত পা ঠান্ডা হয়ে অনেক খারাপ অবস্থা হলে বড় ভাই ও তার বন্ধুরা মিলে হাতেপায়ের তালুতে তেল ডলে মায়ের শরীরের উষ্ণতা বাড়ায়, ঘটনা গুলো যে আমার সামনেই হয়েছিলো বাবা।
সবাই যখন রেজাল্ট সীটে তার বাবার সিগনেচার নিয়ে আসতো আর বলতো কার বাবার হাতের লেখা কেমন, আর আমি ঘরে বসে হাতের লেখা যতটা সম্ভব সুন্দর করে তোমার নাম বসিয়ে দিতাম, আর ভাবতাম বন্ধুদের মাঝে কেন যে বলতে পারি না আমার বাবার হাতের লেখা অনেক বেশি সুন্দর।
সবাই যখন আহলাদি মেয়ে হওয়ার গল্প করতো আমি তখন বঁড়শির ভয়ে পালানো মাছের মতো নিজেকে লুকোতে চাইতাম।
তুমুল ঝড় বৃষ্টির সময় যখন অন্যান্য বন্ধুদের বাবাকে চিন্তিত মুখে ছাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম স্কুল গেইটের বাইরে, আমি সেখানে ও খুঁজতাম তোমাকে , পাইনি কখনো।
যেমনটি তুমি কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার মতো পৃথিবীর মাটিকে এফোঁড় ওফোঁড় করে খুঁজে দেখনি তোমার মেয়ের জন্য একটা ভালো ঘর কোথায় হবে।
আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম তোমাকে ছাড়া।
ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করতাম, কেউ বলছে “উঠে দাঁড়াও মেয়ে, ছুটে চল,ছুঁয়ে দাও ঐ আকাশটাকে।”
তাই করেছিলাম, রীতিমতো দৌড়ে ছুটেছি, ঝড় বৃষ্টির সাথে মিতালি করেছি,নিন্দার কাঁটা পায়ে দলেছি, উপেক্ষার চাহনিকে হেসে উড়িয়েছি।
এতো জোরে দৌড়েছি যে,এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ঋণের ধুলো জমতে জমতে পাহাড় গড়েছে।
তুমি তো ছাতা হয়ে মাথায় ছায়া দাওনি,কিংবা বাবা নামক বটগাছ ও হওনি!
কখনো রোদ বলে, আমি তোকে শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচিয়েছি,কখনো বৃষ্টি বলে আমি তোর ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত শরীরটা কে শান্ত করেছি, বটবৃক্ষ ও স্মিত হেসে বলে আমার অক্সিজেন না হলে কি তুই বাঁচতে পারতি?
ছুটে চলা রাস্তার ইট ও ব্যঙ্গ করে বলে তোর হাঁটতে যেন কষ্ট না হয়,তাই আমি অনেক মসৃণ ছিলাম।
কিভাবে আমি এক জীবনের এতো ঋণ শোধ করবো? খুব অসহায় লাগে বাবা!
কাধ ভর্তি ঋণের বোঝা নিয়ে আমি কখনো বৃক্ষ হই,গায়ে ডালপালা গজাই আর অসহায় পথভ্রষ্ট পথিককে বলি,
“এসো আমার ছায়ায় কিছুক্ষণ বসে শান্ত হও,সঠিক গন্তব্য খুঁজে নাও”,
কখনো বা নিজের মাথার ছাতাটি বিপদগ্রস্ত কারো মাথায় ধরে নিজের জীবনের ঋণ একটু হলেও কমানোর চেষ্টা করি।
জানো বাবা,
কিছু দিন আগে গ্রামবাসী করিম চাচার বাসায় অনেকক্ষন তার সাথে কথা হলো। চলে আসার মুহূর্তে তিনি বললেন, ” মা একটা কথা বলবো? ” আমি বললাম হ্যা চাচা বলেন। তিনি বললেন,” তোমার বাপে কিন্তু অনেক ভালো মানুষ ছিল, এইযে আমি, আমার বয়সী গ্রামে যারা ছিল সবাই আমরা তাঁর ছাত্র ছিলাম। তাঁর ব্যবহার ছিল অমায়িক, শুধু একটু খানি ভুলের জন্য তাঁর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। মানুষ এর চেয়ে কত বড় বড় ভুল করে।”
কিছুক্ষনের জন্য চুপ হয়ে গেলে ও গলা ভেদ করে আমার মুখ দিয়ে যে কথাটা বের হয়েছিল তা হলো, “আমি ও জানি ভালো মানুষ ছিলো, শুধু মানুষের কাছে এই কথাটা বলার সাহস রাখি না আর।”
হ্যাঁ বাবা, সেই আমলে শোকেস ভর্তি তোমার যেসব বইয়ের সংগ্রহ দেখেছি আমি আর কারো কাছেই তা দেখিনি,যতদুর দেখেছি কথার মাধূর্যতায় একশো জনের মধ্যে একজন ছিলে।শুধু মাত্র জীবনের মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ করার অক্ষমতায় তুমি একজন ব্যর্থ মানুষ, ব্যর্থ বাবা।
জীবন পরিচালনায় একজন পরাজিত নাবিক, যার পথনির্দেশক কাটা কম্পাসের সঠিক জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারোনি।
শরীরকে মন থেকে আলাদা করতে পারোনি,ভাবোনি এই শরীর নশ্বর!
নিজ ইচ্ছেকে দায়িত্ববোধের সাথে মিলিয়ে সব এলোমেলো করে দিয়েছো,পৃথিবীর ইতিহাসে তুমি একজন ব্যর্থ নাম ।
একজন ব্যর্থ মানুষের সফল, সুন্দর দিক গুলো ও চরম ভাবে ব্যর্থ হয়,তোমার ও তাই হয়েছে।
মাঝে মাঝে মায়ের দিকে ও তির্যক দৃষ্টি যে হানা দেয়নি তা নয়,কখনো মনে হয়েছে মায়ের মধ্যেই কি ধরে রাখার শক্তি কম ছিলো, অক্ষম ছিলো অভিনয় দক্ষতায় !
এ-ই তো সেই দিন পাশের বাড়ির এক ভাবি বলছিল, তার বাড়ির গৃহ পরিচারিকা ও নাকি তার স্বামী দ্বারা নির্যাতনের শিকার। তবু ও তারা এক ছাদের নিচে আছে বাচ্চাদের জন্য।
বড় বড় কবি সাহিত্যিকগণ ও তো পর নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়,দাম্পত্য জীবনে সুখী ফ্রেমের ভদ্রলোকটিও কোন না নারীর প্রতি আসক্ত, টুপি পরা পুরুষ মানুষটিও নাকি বেশ্যা বাড়িতে যায়, তাদের নাকি যেতে হয়,কিন্তু তাই বলে তাদের সংসার তো নষ্ট হয়নি।
এই কৃতিত্ব যে কার, তার হিসেব আমি মেলাতে পারি না।সেই পুরুষ মানুষদের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা না তা তাদের স্ত্রীদের কঠিন ধৈর্য্যধারণ ও অভিনয় দক্ষতা!
আমার নিজেকে নিয়ে ও অনেক ভয় হয় বাবা,আমি যে অভিনয় জানি না,মায়ের মতো আমারও যে অনেক আত্ম অহংকার!
বাবা তোমার শরীর যেমন পোকা খেয়ে ঝুরঝুরে করে ফেলেছিল,এসব চিন্তা গুলোও আমাকে কুরে কুরে খায়।
খুব কষ্ট হয় ,আমি ঠিক মতো ঘুমুতে পারিনা অন্ধকার খুব কষ্ট দেয় বাবা।
আমি ও যে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি বাবা,মাঝে মাঝে মনে হয় আমার পুরো শরীরে ও পোকা কিলবিল করছে,হয়তো যখন তখন আঙুল ফুঁড়ে দুই একটা বের হয়ে আসবে।
কী অস্বস্তি!
কী কষ্ট বাবা!
রাত প্রায় শেষ, আকাশের তারাগুলো অস্বচ্ছ হচ্ছে,পাশের চেয়ারে অরুর স্বামী কখন এসে বসেছে,অরু তা খেয়ালই করেনি।ওর চোখ দুটো এখন ও আকাশ পানে,যে চোখ থেকে প্রায় প্রতিরাতেই গড়িয়ে পরে হাজার হাজার অশ্রু কণা।
অরুণ স্বামী প্রায় রাতের মতো অনেকটা ঘাড়ে হাত দিয়ে আলতো করে তুলে ঘরের দিকে নিয়ে আসে কোন কথা না বলেই, অরু ও শান্ত বাধ্য মেয়ের মতো এসে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরে।
মাথায় হালকা বিলি কাটায় স্বামীর সান্নিধ্যে অরু ভোরের আলোয় নিশ্চিন্তে ঘুমে তলিয়ে যায়।
লেখক- জেসমীন আক্তার







