Home ভ্রমণ কথা অস্তিত্ব সংকট ও হুমকির মুখে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ, প্রয়োজন সচেতনতা

অস্তিত্ব সংকট ও হুমকির মুখে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ, প্রয়োজন সচেতনতা

299
0
ছবি: Tushar Arnob

অস্তিত্ব ও হমকির মুখে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ। পর্যটক ও কর্তৃপক্ষের অবহেলাই এর জন্য দায়ী। ফেসবুকে একজন ভ্রমণকারী সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে বর্তমান অভিজ্ঞতা ও দ্বীপের বেহাল দশা তুলে ধরেণ। নীচে তা তুলে ধরা হলো। 

“মাত্রাতিরিক্ত বেখেয়ালি পর্যটকের বিবিধ চাহিদা মেটাতে মেটাতে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এখন সত্যিই নিজের অস্তিত্ব সংকটে। এই মনুষ্যঘটিত পরিবেশ বিপর্যয় এখনই থামানো না গেলে, এমন দিন হয়তো খুব শীঘ্রই দেখতে হবে যেদিন জাহাজে চড়ে দূর থেকে ঘুরে ঘুরে দেখতে আর বলতে হবে “অই যে অইখানে ছিলো সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ”। ইদানিং প্রায় প্রতি বছরই আগামী ২/৩ বছরের জন্য সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে ভ্রমণ নিষিদ্ধ হবার গুঞ্জন শোনা যায়। কিন্তু এবার ভ্রমণের পর বুঝলাম, সত্যিকার অর্থেই এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এখন জরুরী।

ছবি: Tushar Arnob

*যদি আগেও সেখানে গিয়ে থাকেন, তবে এই বুঝি ভেঙে পড়লো, এমন জেটি ঘাটে নেমেই দ্বীপের দুর্দশা আন্দাজ করতে পারবেন। ফেরার আগেরদিন দেখলাম লোহার শিট বিছিয়ে ঝালাইয়ের কাজ চলছে। তবে নিচে পিলারের অবস্থাও খুব একটা সুবিধার বলা যায় না। ভারী মাত্রায় সংস্কার প্রয়োজন।

* ঘাট থেকে নেমেই যে পাকা রাস্তা ধরে দ্বীপের ভেতরে প্রবেশ করবেন তার অবস্থাও খুবই করুণ। শত শত অটোরিকশা (স্থানীয়রা বলেন টমটম) দাপিয়ে বেড়ায় সেই সড়ক। ফলাফল হঠাৎ জ্যাম লেগে যাওয়া এবং একটু সাবধানে না হাঁটলে দুয়েকবার রিকশার খোঁচা খাওয়া অস্বাভাবিক কিছু হবেনা। আর এতো এতো অটোরিকশা চার্জ দিতে যদি এতো পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার না হতো, তবে সর্বক্ষণ বাজার, হোটেল, রেস্তোরাঁয় আলো জ্বলতো। হোটেল মালিকেরাও বেশ অসন্তুষ্ট এই লোডশেডিংয়ের অত্যাচারে।
সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে লোডশেডিং, ভাবা যায়?

ছবি: Tushar Arnob

• যে নীল সমুদ্রের খোঁজে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে যাওয়া, সেই নীল জল আর কক্সবাজারের ঘোলা জলের মধ্যে খুব বেশি একটা পার্থক্য এখন অনেক জায়গায়ই আর নেই।

* নারিকেল জিঞ্জিরা এখন মূলত রিসোর্ট জিঞ্জিরা। যত্রতত্র গাছ কেটে প্রসারিত হচ্ছে রকমারি রিসোর্ট বানিজ্য। সামুদ্রিক প্রবাল তুলে বাঁধা হচ্ছে তার ভিটে, ফলাফল উত্তর বীচে ভয়ানক ভাঙনের শুরু। বিশাল বিশাল জিও ব্যাগ ফেলে হোটেল বাঁচানোর চেষ্টা চলছে, তবে সেই সৈকতে জোয়ারের সময় আর হাঁটার জো নেই। একবার ভাবুন সমুদ্র সৈকতে হাঁটছেন, হঠাৎ বড় বড় বস্তায় আটকে গিয়ে পাহাড় চড়ার হালকা ফীল নিয়ে নিলেন। ভালই তো, ভাল না?

ছবি: Tushar Arnob

* এরপর সন্ধ্যা নামে, পশ্চিম বীচ থেকে অপূর্ব সুন্দর সূর্যাস্ত দেখে আপনি ফিরলেন, এবার একটু আরাম করে বসে সমুদ্র উপভোগ করা যাক..
কিন্তু সে উপায় নেই, অধিকাংশ রিসোর্ট এবং দোকানে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় উচ্চশব্দে আইটেম সং বাজানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। গাছের গোড়া থেকে আগামাথা সব ঢেকে যায় লাল নীল বাতিতে। সমুদ্রের গর্জন তখন কান খাড়া করে শুনতে হয়, মনে হয় গোটা দ্বীপটাই যেনো একটা নাইটক্লাব (প্রায়)।

অগণিত তারার নিচে বসে বিশাল সমুদ্র উপভোগ করা বা বন্ধুরা মিলে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার যে অদ্ভুত এক শান্তি সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে ছিলো, তা হারিয়ে গেছে অনেকাংশেই।

ছবি: Tushar Arnob

• যদি ভ্রমণের প্রতি কিছুটাও অনুরাগ থেকে থাকে, তবে যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, সিগারেটের ফিল্টার দেখে আপনার ও মেজাজ গরম হতে বাধ্য। আমি বুঝিনা সামান্য একটা খালি পানির বোতল এমন কি ভারী বস্তু, যে সেটাকে চ্যাপ্টা করে ডাস্টবিন বা উপযুক্ত কোনো যায়গায় ফেলা যায়না? একটা চিপসে্র প্যাকেট ভাজ করে পকেটে রাখতে এমন কী অসুবিধা?
সবাই ভাবে আমি একা একটা বোতল ফেললে কী এমন ক্ষতি হবে?

ছবি: Tushar Arnob

কিন্তু সবাই যদি এই একটা করে বোতলই সৈকতে ফেলে আসে, তাহলে কি হবে ভেবে দেখেছেন?

* যতো বেশি পর্যটক, ততই বেশি বর্জ্য, তারপর সেগুলো একত্রে পোড়ানো, তা থেকে বায়ুদূষণ। কিছু জায়গায় এতো ময়লা জমেছে যে, উটকো গন্ধে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়াই দুষ্কর।

* লাল ডাব (হালকা খয়েরী রঙের) এখন আর চাইলেও পাওয়া যায় না। আমি ৪ দিন খুঁজে একটাও পাইনি।

* জাহাজ চলতে শুরুর পর থেকেই অসংখ্য সী-গাল খাবারের লোভে ভিড় করে জাহাজের চারপাশে, কি অপরুপ দৃশ্য! কিন্তু ওদের এই জাতীয় খাবার না দিলেই মঙ্গল, কেননা বিস্কুট আর চিপস্ ওদের খাবার নয়। এসব খাইয়ে উল্টো আমরা ওদের জন্য বিপদ ডেকে আনছি।

ছবি: Tushar Arnob

আমি কাউকে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করছি না, তবে মনে রাখা উচিত এই জায়গাগুলো আমাদের নিজেদের। যদি আমরাই এসব ধ্বংস করতে থাকি, একদিন সে লজ্জা ও দায় শুধু আমাদেরই হবে।

বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে অনুরোধ করছি- সমুদ্র/পাহাড়/জাদুঘর বা যেখানেই ঘুরতে যান না কেনো- যত্রতত্র আপনার ব্যক্তিগত আবর্জনা ফেলে, গোটা জায়গাটাকেই নোংরা করে দেবেন না।

** পাঁচবার গিয়েছি গত ১৪ বছরে, তাই পার্থক্যটা নিজে বুঝতে পারছি। জায়গাটা আমার খুবই প্রিয় তাই স্ত্রী-কে সাথে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলাম, উনার প্রথমবারই ছিলো। আর ছবির অধিকাংশ বোতলই আমরা দু’জনে মিলে সরিয়ে এসেছি।”

ছবি এবং লিখা: Tushar Arnob